রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্পসহ ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ের মোট ১২টি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)।
বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে চলতি অর্থবছরের একনেকের তৃতীয় সভায় এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
সভা শেষে শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি ও পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার।
অনুমোদিত ১২টি প্রকল্পে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৪৮ হাজার ২৫৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা, প্রকল্প ঋণ ১ লাখ ২০ হাজার ৪৬৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ৫৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয় হবে। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প সাতটি এবং সংশোধিত প্রকল্প পাঁচটি।
সভায় ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ে এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন রুটের নতুন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। পাশাপাশি এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন রুটের সংশোধিত প্রস্তাবও অনুমোদন করা হয়েছে।
গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল করিডোর নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে পাতালপথ।
প্রকল্পটির জন্য সরকার দেবে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিল (ইডিসিএফ) থেকে ঋণ হিসেবে পাওয়া যাবে ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি ১০ লাখ টাকা।
২০১৯ সালে অনুমোদিত এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। সংশোধিত প্রস্তাবে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।
অর্থাৎ প্রকল্পটির ব্যয় ৬১ হাজার ৮৩৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বা ১১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়েছে। সরকারের অনুদান ১৩৩ শতাংশ বেড়ে ৩০ হাজার ৫৫২ কোটি ২৬ লাখ টাকা এবং জাইকার ঋণ ১১২ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেড়ে ৮৩ হাজার ৮৪২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা হবে।
বিমানবন্দরকে কমলাপুরের সঙ্গে এবং নতুন বাজারকে পূর্বাচলের সঙ্গে যুক্ত করবে ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মেট্রোরেল। সংশোধিত ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে কোভিড-১৯ মহামারির সময় নকশা ও দরপত্র প্রস্তুতিতে বিলম্ব এবং দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল বাস্তবায়নের জটিলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের সময় স্টেশনের আকার বাড়ানো, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এবং ভেন্টিলেশন শ্যাফটের অবস্থান পরিবর্তন, রাজারবাগে তিনতলা স্টেশন নির্মাণ এবং নির্মাণকালে যান চলাচল সচল রাখতে প্রায় ২০ কিলোমিটার বিকল্প সড়ক নির্মাণের ব্যয় যুক্ত হয়েছে।
হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন রুটের ব্যয় ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা হয়েছে। এতে ব্যয় বেড়েছে ৪৮ হাজার ৬০৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা বা ১১৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
প্রকল্পে সরকারের অনুদান ৮৪ দশমিক ২২ শতাংশ বেড়ে ২২ হাজার ৩৩০ কোটি ১১ লাখ টাকা এবং জাইকার ঋণ ১৩১ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেড়ে ৬৭ হাজার ৫১৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা হবে।
হেমায়েতপুর-আমিনবাজার অংশ উড়ালপথে এবং আমিনবাজার-ভাটারা অংশ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মধ্য দিয়ে পাতালপথে নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও সংশোধিত প্রস্তাবে সময় বাড়িয়ে ২০৩২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে।
২০১৯ সালে এই দুটি চলমান মেট্রোরেল প্রকল্পের সম্মিলিত প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৩ হাজার ৭৯৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। সংশোধনের পর সম্মিলিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ২৪৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যা আগের তুলনায় ১ লাখ ১০ হাজার ৪৪৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা বা ১১৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি।
গত আগস্টে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের প্রস্তাবিত ২ লাখ ১৩ হাজার ৯৮৫ কোটি ৯ লাখ টাকার তুলনায় সংশোধিত ব্যয় ৯ হাজার ৭৪১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা কম। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির ৩০ আগস্টের বৈঠকের সুপারিশের পর মূল লাইন, ভূমি উন্নয়ন, ভবন, বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক ব্যবস্থা, ইউটিলিটি স্থানান্তর এবং সরঞ্জাম বাবদ ব্যয় পুনর্মূল্যায়ন করে ১৩ সেপ্টেম্বর পরিকল্পনা কমিশনে সংশোধিত প্রস্তাব পাঠানো হয়।
একনেকে অনুমোদিত ১২টি প্রকল্পের মধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের পাঁচটি, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুটি, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দুটি এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি করে প্রকল্প রয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অপর দুটি প্রকল্প হলো ৯৪৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে রাজশাহী সড়ক জোনের আওতাধীন জেলা মহাসড়কসমূহ যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ এবং ১ হাজার ৪৫৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম সড়ক জোনের আওতাধীন জেলা মহাসড়কসমূহ যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ (তৃতীয় পর্যায়)।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প দুটি হলো ১ হাজার ১৫৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে বরিশাল সেনানিবাস স্থাপন—দ্বিতীয় পর্যায় এবং ৩৭৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে খুলনা নৌ অঞ্চলে নৌ সদস্যদের আবাসন সুবিধাসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ।
পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের ২৭০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ে ‘খুলনা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প (প্রথম সংশোধন)’ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্প হলো ৩ হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয়ে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন বাস্তবায়ন এবং ৪ হাজার ৬৬৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ (প্রথম সংশোধিত)।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৮৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে টেক্সটাইল ও চামড়া খাতের শ্রমিকদের কাজের উন্নত পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা বিষয়ক প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৫২ দশমিক ৮১৮৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ে মনপুরা দ্বীপাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয় সম্বলিত পরিকল্পনা মন্ত্রী কর্তৃক ইতোমধ্যে অনুমোদিত ১৫টি প্রকল্পের বিষয়েও একনেককে অবহিত করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জাতীয় সদর দপ্তর নির্মাণ, ভাসানচরে গ্রিন বেল্ট স্থাপন ও কক্সবাজারে বনায়ন, দেশি মুরগি গবেষণা ও উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপন এবং ঝুঁকিপূর্ণ সেতু প্রতিস্থাপনসহ বিভিন্ন প্রকল্প রয়েছে।
সভায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, পানি সম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী সরদার এম এ মুহিত, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি এবং পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট সচিবরা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য করুন