পানিসম্পদ মন্ত্রী ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থান আকস্মিকভাবে ঘটেনি; এর পেছনে বিএনপির টানা ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামই ছিল মূল ভিত্তি। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় বর্তমান বিরোধী দল কোথায় ছিল এবং গত ১৭ বছরে তারা কী ধরনের আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল, সেটিও জনগণের সামনে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের মিলনায়তনে ‘আমরা বাংলাদেশী’ আয়োজিত ‘ন্যায়ভিত্তিক বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে বিভাজন নয়, ঐক্য’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এ্যানি বলেন, বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে যুগপৎ আন্দোলন ও রাজনৈতিক সংগ্রাম চালিয়ে এসেছে। অথচ ৫ আগস্টের পর কেউ কেউ দাবি করছে, তারা একাই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে। বাস্তবে একটি গণঅভ্যুত্থান গড়ে উঠতে হলে তার একটি ভিত্তি প্রয়োজন হয়, আর সেই ভিত্তি ছিল বিএনপির ১৭ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলন।
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের সবাই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়নি এবং সবার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগও নেই। তবে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ‘ভালো আওয়ামী লীগ’কে সঙ্গে নেওয়ার বক্তব্য বিভেদের সূচনা করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নির্বাচন প্রসঙ্গে এ্যানি বলেন, নির্বাচনের আগে বিভিন্ন অনিয়ম ও অর্থসম্পদের বিষয়ে নানা আলোচনা ছিল। সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা অনেকের সঙ্গেও তিনি কথা বলেছেন বলে জানান। তিনি দাবি করেন, কিছু নির্বাচনী এলাকায় বিএনপির একাধিক প্রার্থী থাকায় দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি প্রবাসী ভোটেও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, যেসব আসনে প্রশ্ন উঠেছে সেখানে সুষ্ঠু ও নতুন নির্বাচন নিশ্চিত করতে এখন থেকেই নজরদারি প্রয়োজন।
বিরোধী দলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ১৯৮৬ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলনে তাদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল না। তারা ক্ষমতায় আসার আশা করলেও বাস্তবতা ভিন্ন ছিল। কয়েকটি আসনে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তারা ভালো ফল করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারের কার্যক্রম নিয়ে এ্যানি বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলনের পর জনগণের প্রত্যাশা অনেক। বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র পাঁচ মাস হওয়ায় সব সমস্যার সমাধান এখনো সম্ভব হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন এবং সবার সহযোগিতা পেলে দেশের উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে চুরি, দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে দেশকে নানামুখী সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সীমিত আয়তনের দেশে জনসংখ্যা বাড়লেও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যেমন একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে নানা প্রকল্প নিয়েছিলেন, তেমনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বেও বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আলোচনায় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর ডিবি পুলিশের নির্যাতনের বিষয়ও তুলে ধরেন পানিসম্পদ মন্ত্রী।
লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, বিএনপি বিভাজনের রাজনীতি নয়, জাতীয় ঐক্যের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান বলেন, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেনি, তারাই এখন সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় রয়েছে, যা দেশের জন্য দুঃখজনক।
তিনি আরও দাবি করেন, বিরোধী জোটে ইতোমধ্যে ভাঙন শুরু হয়েছে এবং তাদের ১১ দলীয় জোট এখন ৯ দলে নেমে এসেছে। বিএনপি সরকারের পতনের হুমকি দেওয়ার আগে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার পরামর্শও দেন তিনি।
রাশেদ খান বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও ব্যয় সংকোচনের নীতিতে সাধারণ মানুষ আস্থা রাখছে। বিএনপি ঐক্যের রাজনীতিতে বিশ্বাসী হলেও জামায়াত সে পথে নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে ড. ইউনূসের প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা থাকলেও তার ‘মাইনাস ফর্মুলা’ প্রসঙ্গ উল্লেখ করে সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, বিএনপিকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে এনসিপিকে ক্ষমতায় আনার পরিকল্পনা ছিল, যে কারণে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন চাওয়া হয়নি। তবে জনগণের দাবির মুখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থানের হুমকি দিয়ে বাস্তবে কোনো ফল পাওয়া যাবে না। একসময় জামায়াতের সমালোচনা করা নাহিদ এখন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্ব মেনে নিয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘আমরা বাংলাদেশী’-এর সমন্বয়ক সৈয়দ এহসানুল হুদার সভাপতিত্বে এবং নির্বাহী সদস্য তমিজ উদ্দিন টিটুর সঞ্চালনায় আয়োজিত এ আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান শামসুদ্দিন পারভেজ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মহিউদ্দিন ইকরাম, বিএনপি নেতা মোমিনুল আমিন এবং ইউনাইটেড লেবার পার্টির আমিনুল ইসলামসহ অন্যরা।
মন্তব্য করুন