এক টাকার দুর্নীতিও প্রমাণ করতে পারলে সংসদ সদস্য পদ থেকে ইস্তফা দেবেন—এমন প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তবে তার নিজ নির্বাচনী এলাকা কুমিল্লার দেবিদ্বারে একটি মসজিদের সংস্কারকাজ ঘিরে সরকারি বরাদ্দ, ই-টেন্ডার এবং অর্থ ব্যয়ের বিষয় নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দেবিদ্বার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের মরিচাকান্দা পূর্বপাড়ার বাইতুলফালা জামে মসজিদ। স্থানীয়দের দাবি, জাতীয় নির্বাচনের আগে হাসনাত আবদুল্লাহ ব্যক্তিগত তহবিল থেকে মসজিদের সংস্কার করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পাশাপাশি শাপলা প্রতীকে ভোট দেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচিত হওয়ার পর দীর্ঘ সময়েও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। পরে সমালোচনার মুখে তার অনুসারীরা এসে সীমিত পরিসরে কিছু সংস্কারকাজ সম্পন্ন করেন।
একজন স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, নির্বাচনের আগে ব্যক্তিগত অর্থে কাজ করার আশ্বাস দেওয়া হলেও পরে জানা যায়, মসজিদের জন্য ১১ লাখ ৮১ হাজার টাকার সরকারি বরাদ্দ এসেছে। তার ভাষ্য, বাস্তবে সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকার বেশি কাজ হয়নি।
এলাকার এক তরুণের অভিযোগ, বরাদ্দ আনার পর যে ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ করানো হয়েছে, সেই কাজের মানও সন্তোষজনক নয়।
স্থানীয়দের আরও দাবি, সর্বোচ্চ তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকার কাজ হয়েছে এবং শুরুতে তারা এটিকে এমপির ব্যক্তিগত অর্থায়নে পরিচালিত কাজ বলেই জানতেন।
মসজিদ কমিটির উপদেষ্টা সিরাজুল ইসলাম মিরণ বলেন, তাদের জানানো হয়েছিল ব্যক্তিগত অর্থে যত টাকা লাগবে, তত টাকা ব্যয় করে সংস্কারকাজ সম্পন্ন করা হবে। পরে একজন ঠিকাদারের সঙ্গে আলোচনা করে তারা জানতে পারেন, সম্পন্ন হওয়া কাজের আনুমানিক ব্যয় তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকার বেশি নয়।
পরবর্তীতে জেলা প্রশাসকের এক সভায় তারা জানতে পারেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ই-টেন্ডারের মাধ্যমে বাইতুলফালা জামে মসজিদের নামে ১১ লাখ ৮১ হাজার টাকার সরকারি বরাদ্দ অনুমোদিত হয়েছে। মসজিদ কমিটির দাবি, এ বিষয়ে তাদের আগে কোনো তথ্য জানানো হয়নি।
সিরাজুল ইসলাম মিরণের ভাষ্য, শুরুতে ব্যক্তিগত অর্থায়নের কথা বলা হলেও পরে সরকারি বরাদ্দের বিষয়টি সামনে আসে। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে বিভ্রান্তি ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সংসদে নীতির কথা বললেও নিজ এলাকায় সরকারি বরাদ্দের ব্যবহারে এমন প্রশ্ন উঠবে, তা তারা কল্পনাও করেননি।
মিরণ আরও বলেন, বিষয়টি সমাজের মানুষকে কষ্ট দিয়েছে। তিনি সরকারি বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
ই-টেন্ডারের আবেদনকারী ইয়াহিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আবেদন করলেও প্রকল্পের মোট বরাদ্দ কত ছিল, সে বিষয়ে তাকে অবহিত করা হয়নি। তার দাবি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও তাদের দেখানো হয়নি এবং বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের টালবাহানা করা হয়েছে।
অন্যদিকে কার্যাদেশপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মমতাজ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. ফরহাদুল মিজান জানান, তিনি কাজটি সাব-ঠিকাদার বিল্লাল হোসেনকে দিয়ে করিয়েছেন। তার দাবি, জেলা পরিষদের প্রকৌশলীরা কাজের তদারকি করেছেন এবং অনিয়মের সুযোগ ছিল না।
বিল্লাল হোসেন বলেন, তিনি নিজে কাজ না করে রিয়াদ নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে এটি সম্পন্ন করিয়েছেন। তার ভাষ্য, রিয়াদ স্থানীয় এনসিপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন। তিনি আরও জানান, আগে ঠিকাদারি করলেও কয়েক বছর ধরে নিজে কাজ করছেন না।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিল্লাল দেবিদ্বার ক্যাপ্টেন সুজাত আলী সরকারি কলেজের নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সভাপতি এবং জুলাই আন্দোলনের হত্যা মামলার আসামি।
কালের কণ্ঠের হাতে আসা নথি অনুযায়ী, বিল্লাল রিয়াদের কথা বললেও বাস্তবে কাজটি সম্পন্ন করেছেন তার ছোট ভাই ইকবাল হোসেন।
এদিকে দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বরাদ্দের অর্থ ব্যবহারে কোনো অনিয়ম বা অসঙ্গতির প্রমাণ মিললে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. গোলাম জাকারিয়া বলেন, উত্থাপিত অভিযোগ তিনি নোট করেছেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন