জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করতে গিয়ে হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন ‘মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতি’র সদস্য ও কাফরুলের বিজয় রাকিন সিটির ফ্ল্যাট মালিকরা। তাঁদের দাবি, হামলাকারীরা সংবাদ সম্মেলনের ব্যানার ছিঁড়ে ফেলে এবং মুক্তিযোদ্ধা ও ফ্ল্যাট মালিকদের মারধর করে বের করে দেয়। একই সময়ে আবাসনটির ভবনগুলোতে হামলা চালিয়ে নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
ঢাকা, ৩১ অক্টোবর ২০২৬: জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করতে গিয়ে বহিরাগতদের হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন ‘মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতি’র (রেজি. নং: ঢ-০৩৮০১/৯৭; জামুকা রেজি. নং: ২৪৯/২০১৮) নিবন্ধিত সদস্য ও কাফরুলের বিজয় রাকিন সিটির ফ্ল্যাট মালিকরা।
শনিবার আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা অভিযোগ করেন, একদল বহিরাগত তাঁদের ব্যানার ছিঁড়ে ফেলে এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ফ্ল্যাট মালিকদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে হুমকি দিয়ে মিলনায়তন থেকে বের করে দেয়। একই সময়ে বিজয় রাকিন সিটিতে হামলা চালিয়ে আবাসিক ভবনগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছে। এতে সেখানে বসবাসরত মুক্তিযোদ্ধা, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও শিশুরা নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন বলে দাবি করেন তাঁরা।
সমিতির তহবিল থেকে প্রায় আড়াই কোটি টাকা আত্মসাৎ, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত প্রশাসকদের অপসারণ, বিতর্কিত নির্বাচন বাতিল, বৈধ কার্যনির্বাহী পরিষদ পুনর্বহাল এবং বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপনের কথা ছিল।
**সংবাদ সম্মেলনে হামলা ও আবাসনে তাণ্ডবের অভিযোগ**
উপস্থিত ফ্ল্যাট মালিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা জানান, তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে সংবাদ সম্মেলন শুরু করার পরপরই একদল সশস্ত্র বহিরাগত মিলনায়তনে প্রবেশ করে ব্যানার ছিঁড়ে ফেলে। এ সময় উপস্থিত সদস্য ও ফ্ল্যাট মালিকদের মারধর করা হয় এবং স্লোগান দিতে দিতে তাঁদের মিলনায়তন থেকে বের করে দেওয়া হয়।
তাঁদের অভিযোগ, একই সময়ে বিজয় রাকিন সিটির ভেতরেও হামলা চালানো হয়। এতে একজন ফ্ল্যাট মালিক আহত হন এবং কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী মারধরের শিকার হন। বহিরাগত ব্যক্তিদের অবাধ যাতায়াত ও অবস্থানের কারণে বাসিন্দারা কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন বলেও দাবি করেন তাঁরা।
**প্রশাসক নিয়োগ ও কার্যালয়ে হামলার অভিযোগ**
লিখিত বক্তব্যে সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০০০ সালে বহিষ্কৃত এবং ২০১৬ সালে ব্যাংকিং সুদের টাকা বুঝে নিয়ে স্বত্ব ত্যাগকারী নঈম জাহাঙ্গীর ও বেলায়েত হোসেনের নেতৃত্বে একটি বহিরাগত চক্র সমিতির কার্যালয়ে হামলা চালায়। এ সময় নথিপত্র ও নগদ টাকা লুট এবং পেট্রোল ঢেলে মূল রেকর্ডপত্র পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ করা হয়।
বক্তব্যে আরও দাবি করা হয়, নির্বাচিত কমিটির কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বেআইনিভাবে একের পর এক প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়।
**প্রায় আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ**
সমিতির দাবি, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম প্রশাসক আবু মাসুদ ব্যাংক হিসাব থেকে ১ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা রয়েছে বলে জানানো হয়।
পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টের স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ এবং ব্যাংক হিসাব স্থগিতের নির্দেশ অমান্য করে তৃতীয় প্রশাসক আবু মো. ইশতিয়াক আজিজ (উলফাত) আরও ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা উত্তোলন ও আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ করা হয়। দুই প্রশাসকের বিরুদ্ধে সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছেন সমিতির সদস্যরা।
**নির্বাচন স্থগিতের পেছনে জালিয়াতির অভিযোগ**
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, হাইকোর্ট বিভাগ রিট নম্বর ৯৫২৯/২০২৫-এর পরিপ্রেক্ষিতে ২২ জুলাই ২০২৬ তারিখে দেওয়া রায়ে নির্বাচিত কমিটি বিলুপ্তির সিদ্ধান্তকে অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বেআইনি ঘোষণা করেন।
সমিতির সদস্যদের অভিযোগ, ওই আদেশের পরও আর্থিক অনিয়ম আড়াল এবং বহিরাগতদের সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে অস্তিত্বহীন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করে ভুয়া ভোটার তালিকা তৈরি করা হয়। এর ভিত্তিতে ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে একটি নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা করা হয়। পরে জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নির্বাচনটি স্থগিতের নির্দেশ দেন বলে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।
**ফ্ল্যাট দখল ও হয়রানিমূলক মামলার অভিযোগ**
সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৯৭ সালে নিবন্ধিত সংগঠনটির সদস্যরা সরকারি চালানের মাধ্যমে মোট ২৮ কোটি ৮৮ লাখ ৮০ হাজার ৪১৫ টাকা পরিশোধ করে ১৬ দশমিক ০২ একর জমি লিজ নেন। পরে বৈধ বণ্টননামা ও নামজারির মাধ্যমে তাঁরা ফ্ল্যাট বরাদ্দ পান।
তবে প্রশাসক ও বহিরাগত একটি চক্র বৈধ সদস্যদের ফ্ল্যাট দখল করে অ-সদস্যদের কাছে ভাড়া দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তাঁরা। এতে অবৈধভাবে অর্থ আদায় এবং ২৭৪টি পরিবারের মালিকদের উচ্ছেদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করা হয়।
এ ছাড়া সমিতির নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক মোর্শেদুল আলম এবং বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও শারীরিক প্রতিবন্ধী দপ্তর সম্পাদক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলুকে মিথ্যা মামলায় দীর্ঘদিন কারাবন্দি রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়।
**ফ্ল্যাট মালিক ও বাসিন্দাদের পাঁচ দফা দাবি**
সংবাদ সম্মেলনে ফ্ল্যাট মালিক ও বাসিন্দারা পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হলো—
১. জাতীয় প্রেসক্লাব ও বিজয় রাকিন সিটিতে হামলার ঘটনায় জড়িত বহিরাগতদের গ্রেপ্তার করে আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করা।
২. বহিরাগতদের হস্তক্ষেপে নিয়োগ পাওয়া এবং আদালতের আদেশ অমান্য করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত প্রশাসক ইশতিয়াক আজিজ উলফাতকে অপসারণ ও বিচারের আওতায় আনা।
৩. ২০২৪ সালের ৭ ডিসেম্বর দায়িত্ব নেওয়া সমাজসেবা অধিদপ্তর অনুমোদিত বৈধ কার্যনির্বাহী পরিষদকে পুনর্বহাল এবং তাদের কাছে প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তর করা।
৪. বিজয় রাকিন সিটিতে অনধিকার প্রবেশকারী বহিরাগতদের উচ্ছেদ করে ৫০৭টি পরিবারের নিরাপত্তা ও আবাসিক পরিবেশ নিশ্চিত করা।
৫. সমিতির সদস্য ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করা।
সংবাদ সম্মেলনে ফ্ল্যাট মালিক বীর মুক্তিযোদ্ধা স্কয়ারটন লিডার কাজী মফিজ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে, নাগরিকদের জীবনের অধিকার হরণ করে এই দুর্বৃত্ত চক্র আজ পুরো আবাসনকে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে।”
তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচার বিভাগের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।