অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Oct 24, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

সরকার ও দল সামলাতে নতুন চ্যালেঞ্জে বিএনপি

দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থেকে রাজনৈতিক আন্দোলন, মামলা ও নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলার পর এখন নতুন বাস্তবতার মুখে বিএনপি। রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠন, তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন, দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোনয়ন ঘিরে বিরোধ সামাল দেওয়াই দলটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।


দেড় দশকের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এখন সরকার ও দল—দুই ক্ষেত্রেই একসঙ্গে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। সরকারের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি দলীয় সাংগঠনিক কাঠামো সচল রাখা, মেয়াদ শেষ হওয়া কমিটি পুনর্গঠন এবং তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রের যোগাযোগ শক্তিশালী করার বিষয়গুলো সামনে এসেছে।

বিশেষ করে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের প্রতিযোগিতা, স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টি বিএনপির জন্য নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। সরকার পরিচালনার ব্যস্ততার মধ্যেও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানো এবং কেন্দ্র ও তৃণমূলের দূরত্ব কমানোর ওপর দলটির সাংগঠনিক স্থিতিশীলতা অনেকটাই নির্ভর করছে।

গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরজুড়ে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে সাংগঠনিক পরিবর্তন, কমিটি বিলুপ্ত এবং বহিষ্কারের ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় এসেছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত এবং সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে নেওয়া সাংগঠনিক ব্যবস্থা দলটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।

একটি রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক শক্তির মূল ভিত্তি ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের কমিটি। এসব কাঠামোর মাধ্যমেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে দলের যোগাযোগ তৈরি হয় এবং নতুন নেতৃত্ব উঠে আসে। তবে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোর একটি বড় অংশে দীর্ঘদিন ধরে স্থবিরতা রয়েছে।

দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির ৮২টি জেলা ও মহানগর কমিটির মধ্যে ৭২টির মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। দীর্ঘদিন জাতীয় কাউন্সিল না হওয়া এবং বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটি পুনর্গঠিত না হওয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সীমিতসংখ্যক নেতার প্রভাব বেড়েছে। এতে নতুন ও তরুণ নেতৃত্বের সামনে আসার সুযোগও সংকুচিত হয়েছে।

মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠনকে শুধু সাংগঠনিক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের বিকেন্দ্রীকরণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে মাঠপর্যায়ে অনেক পুরোনো কমিটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লেও নতুন কমিটি গঠনে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। আবার কোনো কোনো এলাকায় পুরোনো নেতাদের নতুন কমিটিতেও নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা নিয়ে তৃণমূলে অসন্তোষ রয়েছে।

সাংগঠনিক পুনর্গঠনের মধ্যে গত ৩০ সেপ্টেম্বর বড় পরিবর্তন আসে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিতে। ওই দিন সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ না করে সংগঠনটির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। একই সময়ে যুবদল ও ছাত্রদলের সংশ্লিষ্ট কয়েকটি কমিটিও ভেঙে দেওয়া হয়।

গত দেড় দশকে রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় থাকা, মামলা মোকাবিলা করা এবং বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত নেতা-কর্মীদের প্রত্যাশাও এখন বেড়েছে। নতুন কমিটি এবং আসন্ন নির্বাচনগুলোতে নিজেদের যথাযথ মূল্যায়ন চান তারা। তবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সংগঠন পরিচালনায় দক্ষতা, বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের সক্ষমতা এবং সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতাকেও নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিচ্ছে।

যশোরের এক তৃণমূল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিরোধী দলে থাকার সময় তারা পুলিশের লাঠিপেটার শিকার হয়েছেন। কিন্তু দল ক্ষমতায় আসার পর দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা কিংবা বিদেশে অবস্থান করা অনেকেই এখন পদ পাওয়ার জন্য কেন্দ্রে তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরেও তৃণমূলে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা বাড়ছে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়াকে জয়ের পথে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখার একটি ধারণা দলটির তৃণমূলে তৈরি হয়েছে।

এর ফলে একই এলাকায় একাধিক প্রভাবশালী নেতা দলীয় প্রার্থী হতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কোথাও কোথাও এই প্রতিযোগিতা ব্যক্তিগত বিরোধ, পরস্পরের বিরুদ্ধে কুৎসা এবং পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার পর্যায়েও পৌঁছাচ্ছে। কেন্দ্র থেকে সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সব ক্ষেত্রে তা কার্যকর হচ্ছে না। প্রার্থী বাছাইয়ে সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ লিখিত মানদণ্ড না থাকার অভিযোগের পাশাপাশি লবিং-বাণিজ্যের অভিযোগও উঠছে। এই বিরোধ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় ঐক্য ধরে রাখাও কঠিন হতে পারে।

ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দলের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব কিংবা অন্য কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ডে কেউ জড়ালে তার প্রভাব পুরো দলের ভাবমূর্তির ওপর পড়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বহিষ্কারের সংখ্যা দিয়ে দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি মূল্যায়ন করা যথেষ্ট নয়। গুরুতর অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হচ্ছে কি না এবং একই ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল নেতা-কর্মীদের জন্য একই নিয়ম প্রয়োগ হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রমাণিত অপরাধ এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বা দলীয় কোন্দলের কারণে ওঠা অভিযোগের মধ্যে পার্থক্য নিশ্চিত করাও জরুরি। তা না হলে দলের অভ্যন্তরীণ ন্যায়বিচারের প্রতি নেতা-কর্মীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ জন্য অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সবার ক্ষেত্রে একই নিয়মে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিএনপির সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দল ও সরকার পরিচালনার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। দলটির শীর্ষ ও প্রভাবশালী নেতাদের অনেকেই বর্তমানে মন্ত্রিসভা, সংসদ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত। ফলে সাংগঠনিক কার্যক্রমে আগের মতো সময় দেওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।

কেন্দ্রীয় নেতাদের সরকারি দায়িত্বে ব্যস্ততা বাড়ায় নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ের দলীয় কার্যালয়গুলোতেও নেতৃত্বের শূন্যতা অনুভূত হচ্ছে। তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের পক্ষেও আগের মতো সহজে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে কেন্দ্র ও তৃণমূলের মধ্যে দূরত্ব এবং অসন্তোষ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকার ও দলের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা না গেলে সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, বিএনপির সামনে বর্তমানে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দ্রুত পুনর্গঠন, স্থানীয় নির্বাচনে মনোনয়ন ঘিরে অভ্যন্তরীণ বিরোধ এড়ানো এবং সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখা—এসব বিষয় একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তার মতে, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যকার দূরত্ব কমানো এখন বিএনপির অন্যতম প্রধান কাজ। সিদ্ধান্ত গ্রহণে তৃণমূলের অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছতা এবং সাধারণ মানুষের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলে দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বাংলানিউজকে বলেন, দলীয় শৃঙ্খলা এবং সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় বিএনপি কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যত বড় নেতাই হোন না কেন, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বদ্ধপরিকর বলে জানান তিনি।

শামসুজ্জামান দুদু আরও বলেন, কোনো দল ক্ষমতায় থাকলে তাকে ঘিরে নানা ধরনের বিভ্রান্তি ও গুজব ছড়িয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়। সময়ের সঙ্গে বিএনপি এসব সমস্যার সমাধান করতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।


মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ফার্মগেটে মসজিদে গোপন বৈঠক, আটক ২৩

1

বিসিসির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করল নির্বাচন কমিশন

2

ডাকসুর ফ্লোরে জিন্নাহ-গোলাম আযমের ছবি, পদদলিত করলেন শিক্ষার্

3

চেয়ার কার, দায়িত্ব কার? পীরগঞ্জ সেটেলমেন্ট অফিসে সার্ভেয়ারের

4

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে শান্তিপূর্ণ ভোট, মাঠে কঠোর নিরাপত্তা

5

ঢাকায় শুরু আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা বিটিটিএফ ২০২৬, অংশ নিচ্ছে

6

৩৩ হাজার ফিলিস্তিনি ঘরছাড়া, মানবতাবিরোধী অপরাধের শঙ্কা জাতিস

7

প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন নীতিমালা পুনর্মূল্যায়নে ১৭ সদস্যের কমিট

8

ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করতে গিয়ে জানলেন তিনি ‘মৃত’

9

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যে সংবিধান সংশোধন

10

পীরগঞ্জে হতদরিদ্রদের ৭ গরু ও নিমের চারা বিতরণ

11

দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনে চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রী তারেক র

12

সাংগু-মাতামুহুরীর পানি বিপৎসীমার ওপরে, বান্দরবানে বন্যা পরিস

13

শক্তিশালী স্থানীয় সরকারই গণতন্ত্রের ভিত্তি: মির্জা ফখরুল

14

সব ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ গড়ি: প্রধানমন্ত্রী

15

টয়োটার প্রথম প্রাইভেট কারে উঠলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

16

ফুলবাড়ীতে মাদ্রাসা, শিক্ষার্থী ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝ

17

পাকিস্তানে সন্ত্রাসবিরোধী আইন কি বিরোধী দমনের হাতিয়ার?

18

পুতিন-কিমের সঙ্গে চুক্তি চান ট্রাম্প

19

ফুলবাড়ীতে ১৫ যুবক পেল ইলেকট্রিক্যাল হাউজ ওয়্যারিং প্রশিক্ষণ

20