অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Oct 24, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিন

প্রায় ২০০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিন সফলভাবে পুনরুদ্ধারের পর এবার বাণিজ্যিক উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফুটি কার্পাস তুলা শনাক্ত, হাতে সূক্ষ্ম সুতা তৈরি ও ঐতিহ্যবাহী তাঁতে কাপড় বোনার প্রযুক্তি পুনরুদ্ধারের পর তা বেসরকারি খাতে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।


একসময় বাংলার রাজদরবার ও অভিজাত শ্রেণির পোশাক হিসেবে বিশেষ মর্যাদা পাওয়া ঢাকাই মসলিন ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতো। অত্যন্ত সূক্ষ্ম বুনন ও মিহি সুতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারেও এই কাপড়ের ব্যাপক কদর ছিল। নানা কারণে প্রায় দুই শতাব্দী আগে হারিয়ে যাওয়া এই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে ২০১৩ সালে সরকারি উদ্যোগে পুনরুদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়।

দীর্ঘ গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ফুটি কার্পাস তুলা শনাক্ত করার পাশাপাশি হাতে সুতা কাটা এবং ঐতিহ্যবাহী তাঁতে মসলিন বোনার প্রযুক্তিও পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। পুনরুদ্ধার করা মসলিন বিভিন্ন মেলা ও প্রদর্শনীতে তুলে ধরার পর দেশি-বিদেশি ক্রেতা ও উদ্যোক্তাদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

ঢাকাই মসলিন পুনরুদ্ধার প্রকল্পের পরিচালক মো. আইয়ুব আলী বলেন, এতদিন পাঠ্যবইয়ে পড়া বাঙালির ঐতিহ্য এখন দেশেই তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। শুধু মসলিন কাপড় নয়, এটি তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিও পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।

তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জাপানের উদ্যোক্তা ও ক্রেতারা ঢাকাই মসলিনের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন। ফ্রান্সে মুঘল ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করা কয়েকজনের সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫০০ গজ মসলিন নেওয়ার অনুরোধ পাওয়া গেছে।

দেশে বাণিজ্যিকভাবে মসলিন উৎপাদনের অনুমতি চেয়ে ইতোমধ্যে ১৫ জন উদ্যোক্তা আবেদন করেছেন। উপযুক্ত উদ্যোক্তাদের অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তরের নিয়ম ও পদ্ধতিও নথিভুক্ত করা হয়েছে।

বিভিন্ন মেলা ও প্রদর্শনীতে মসলিন দেখে দেশের শৌখিন ও সচ্ছল ক্রেতাদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে প্রকল্পের আওতায় তৈরি নমুনা কাপড় এখনই বিক্রির পরিকল্পনা নেই। বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বিপণনব্যবস্থা গড়ে ওঠার পর সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বাজারে ঢাকাই মসলিন ছাড়া হবে।

প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ২৭টি শাড়ি, ২০টি স্কার্ফ এবং রুমালের মতো ১১টি নমুনা কাপড় তৈরি করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ৩১টি শাড়ি ও ১৪টি স্কার্ফ তৈরি হয়েছে। এসব নমুনা বর্তমানে সংরক্ষিত রয়েছে।

ঢাকাই মসলিন পুনরুদ্ধারে ঐতিহাসিক নথিপত্র, গবেষণাপত্র ও বিভিন্ন জাদুঘরে সংরক্ষিত মসলিনের নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। প্রকল্পের মুখ্য গবেষক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মঞ্জুর হোসেন জানান, গবেষণায় জেমস টেলরের ‘এ স্কেচ অব দ্য টপোগ্রাফি অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস অব ঢাকা’, অধ্যাপক আবদুল করিমের ‘ঢাকাই মসলিন’ এবং সুইডিশ বিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়াসের ‘স্পিসিস প্ল্যান্টারাম’ বই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

ঐতিহাসিক মসলিনের নমুনা পরীক্ষায় যুক্তরাজ্যের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামের সহায়তাও নেওয়া হয়। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ৩৯টি তুলার নমুনা পরীক্ষা করে ছয়টি জাত শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে গাজীপুরের কাপাসিয়া এলাকার তুলার সঙ্গে ঐতিহাসিক মসলিনে ব্যবহৃত ফুটি কার্পাস তুলার ডিএনএর প্রায় ৯৬ শতাংশ মিল পাওয়া যায়।

ঐতিহাসিক নথি ও জেমস টেলরের বিবরণ বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা কাপাসিয়ায় ফুটি কার্পাস তুলা পাওয়ার সম্ভাবনা চিহ্নিত করেন। একই সঙ্গে তিতাবাদি নামের একটি স্থান নিয়েও অনুসন্ধান চালানো হয়। এসব গবেষণার ভিত্তিতে তুলা চাষ, হাতে সুতা কাটা এবং ঐতিহ্যবাহী তাঁতে মসলিন বোনার কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়।

ঢাকাই মসলিনকে সাধারণ মসলিন থেকে স্বতন্ত্র করেছে নির্দিষ্ট জাতের তুলা, হাতে কাটা অতিসূক্ষ্ম সুতা, দক্ষ কারিগর এবং বিশেষ ধরনের তাঁতের সমন্বয়। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ঢাকা ও এর আশপাশের অঞ্চল—বিশেষ করে সোনারগাঁ, কাপাসিয়া এবং শীতলক্ষ্যা ও মেঘনা নদীর অববাহিকার উর্বর পলল মাটিতে ফুটি কার্পাস তুলা জন্মাত।

অতিসূক্ষ্ম সুতা তৈরির ক্ষেত্রে আর্দ্র পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী এলাকায় সকাল কিংবা সন্ধ্যায় সুতা কাটার কাজ করা হতো। শুষ্ক বাতাসে সূক্ষ্ম সুতা ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেত। দক্ষ নারী ও পুরুষ কারিগররা বংশপরম্পরায় অর্জিত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সুতা তৈরি ও কাপড় বুনতেন।

প্রকল্প পরিচালক আইয়ুব আলী জানান, কাপাসিয়ার তুলা থেকে তৈরি সুতায় সিল্কের মতো স্পর্শ পাওয়া যায়। ঐতিহাসিক মসলিনের সূক্ষ্মতা ও বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনতে ফুটি কার্পাসের জাত শনাক্ত করা ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

ফুটি কার্পাসের জাত শনাক্তের পর গাজীপুরে তুলা বোর্ডের জমি এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জমিতে এই তুলার চাষ করা হয়। একই সঙ্গে মসলিন তৈরির দক্ষ কারিগর গড়ে তুলতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কারিগর নির্বাচনের জন্য কুমিল্লার চান্দিনায় খাদি কাপড় তৈরির সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৪০০ জনের মধ্য থেকে ছয়জনকে বাছাই করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। হাতে সুতা কাটার চরকা তৈরি, সুতা প্রস্তুত, নাটাই করা, তাঁতে সুতা সাজানো এবং কাপড় বোনাসহ বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়েছে।

আইয়ুব আলী জানান, এসব প্রশিক্ষিত কারিগরের পাশাপাশি মসলিন হাউসে প্রশিক্ষণ পাওয়া ১৩০ জন তাঁতি ও কারিগরকেও ভবিষ্যৎ উৎপাদন কার্যক্রমে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।

অধ্যাপক ড. মঞ্জুর হোসেনের মতে, বড় পরিসরে মসলিন উৎপাদন করতে হলে ফুটি কার্পাস তুলার সরবরাহ বাড়াতে হবে। এ জন্য উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তুলা চাষের প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া এবং চুক্তিভিত্তিক তুলা উৎপাদনের মাধ্যমে চাষি ও উৎপাদকদের মধ্যে সংযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

বেসরকারি খাতে বাণিজ্যিকভাবে মসলিন উৎপাদন শুরু হলে তুলা চাষ, সুতা কাটা, কাপড় বোনা, মান নিয়ন্ত্রণ ও বিপণনের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। গ্রামীণ পর্যায়ের তুলাচাষি ও কারিগরদেরও এই উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে বড় পরিসরে উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত ফুটি কার্পাস তুলার সরবরাহ, দক্ষ কারিগর, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং কার্যকর বিপণনব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে অতিসূক্ষ্ম মসলিন তৈরি সময়সাপেক্ষ হওয়ায় সাধারণ কাপড়ের তুলনায় এর দাম বেশি হতে পারে। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের নাগালে এর দাম কতটা থাকবে, তা উৎপাদন ব্যয় ও বাজারজাতকরণ কৌশলের ওপর নির্ভর করবে।

পুনরুদ্ধার করা প্রযুক্তি, দেশি-বিদেশি ক্রেতাদের আগ্রহ এবং ১৫ উদ্যোক্তার আবেদনের মধ্য দিয়ে ঢাকাই মসলিনের বাণিজ্যিক উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি বছরের শেষ নাগাদ উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই শিল্পের সম্প্রসারণ নির্ভর করবে পর্যাপ্ত তুলা, দক্ষ কারিগর, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বেসরকারি বিনিয়োগের সমন্বয়ের ওপর।


মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে মালয়েশিয়ার সঙ্গে এফটিএ চায় বাংলা

1

ইউসিবির ডিএমডি হলেন শফিকুর রহমান ও রীদওয়ানুল হক

2

২০টিরও বেশি দেশের অংশগ্রহণে ২৯ অক্টোবর বিটিটিএফ ২০২৬

3

একনেকে ১৫ হাজার ৮২৩ কোটি টাকার ১৩ প্রকল্প অনুমোদন

4

জাতিসংঘে নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রা ও রোহিঙ্গা সংকট তুলে ধরবেন

5

সৌদি আরবে নিরাপত্তাঝুঁকি, ঢাকা-দাম্মাম ও রিয়াদ ফ্লাইট স্থগিত

6

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে এক লাখ কোটি ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবন

7

বিসিসির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করল নির্বাচন কমিশন

8

বিশ্ব বাস্তবতায় জাতিসংঘের ছয় অগ্রাধিকার

9

সরকারের ব্যর্থতায় দেশ আতঙ্কের জনপদ: সিপিবি সভাপতি

10

রাণীশংকৈলে জামিনের পর ফের ইয়াবাসহ বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা গ্রেপ

11

ফুলবাড়ীতে ট্রান্সফরমার-তার চুরি বেড়েই চলছে

12

ঢাকায় কবরের জায়গার সংকট, শেষ ঠিকানার মূল্য কোটি টাকা

13

ঠাকুরগাঁওয়ে শব্দ ও বায়ুদূষণবিরোধী মোবাইল কোর্ট, জরিমানা আদ

14

প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছিলেন এই তারকারাও

15

ফুলবাড়ীতে প্রতিবন্ধীর জমি দখলের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন

16

অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ‘ভয়াবহ ও লজ্জাজনক’, ক্ষুব্ধ ওয়ার্নার

17

তাহসিফের মৃত্যু নিয়ে তদন্তের আগে মন্তব্য নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্

18

ইউনূসকে ‘বাটপার’ বললেন ফিরোজ রশীদ

19

পূজার ছুটিতে নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল, ডজনপ্রতি ১০ টাকা কমল

20