পীরগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মফিজুল হককে সমাজে ‘দুর্নীতিবাজ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য একটি মহল দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সামান্য কোনো অভিযোগ উঠলেই আমার প্রিয় সাংবাদিক ভাইদের একটি অংশ তার নাম জড়িয়ে বড় বড় ‘দুর্নীতিবাজ’ শিরোনামে ধারাবাহিকভাবে সংবাদ প্রকাশ করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আজ পর্যন্ত কতজন সাংবাদিক বিদ্যালয়টির সার্বিক কার্যক্রম, আয়-ব্যয় ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিরপেক্ষভাবে যাচাই-বাছাই করে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন?
আমার অভিভাবকতুল্য শ্রদ্ধেয় স্যার সম্প্রতি মন্তব্য করেছিলেন, এখন নাকি সাংবাদিকও ভাড়া পাওয়া যায়। তাহলে কি ধরে নেব, অনুসন্ধানের পরিবর্তে অনেকেই ভাড়ার দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত? নাকি প্রকৃত সত্য সামনে আনতে অনীহা কাজ করছে? ভাবছেন হয়তো ভুল পড়ছেন! না, আপনি ঠিকই পড়ছেন। সত্য উচ্চারণে দ্বিধার কী আছে?
যাইহোক, পীরগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সার্বিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে আমার কাছে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন বলেই মনে হয়েছে। বাকিটা বিবেচনার দায়িত্ব আপনাদের।
২০০৯ সালে মফিজুল হক প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। একই সঙ্গে অবকাঠামোগত উন্নয়নেও দৃশ্যমান অগ্রগতি ঘটে। তার দায়িত্বকালেই প্রায় ৩৪ লাখ ৪৯ হাজার টাকা ব্যয়ে একাডেমিক ভবন নির্মাণ, প্রায় ৪ লাখ টাকা ব্যয়ে দৃষ্টিনন্দন প্রবেশদ্বার নির্মাণ, প্রায় ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন টিনশেড মার্কেট নির্মাণ ও পুরোনো মার্কেটকে দোতলা পর্যন্ত সম্প্রসারণ, প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে মসজিদ নির্মাণ, প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, শান্তিবাগ মাঠে প্রায় আড়াই লাখ টাকা ব্যয়ে মাটি ভরাট, প্রায় ২ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ে টিচার্স কমনরুম সম্প্রসারণ ও সংযুক্ত বাথরুম নির্মাণ এবং প্রভাতী শাখার দ্বিতীয় লিফট চালুর লক্ষ্যে প্রায় ১৪ লাখ টাকার আসবাবপত্র ক্রয় করা হয়।
এত দৃশ্যমান উন্নয়ন সত্ত্বেও বর্তমানে তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ—এসব কাজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বান করা হয়নি কিংবা ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়নি। সরকারি নিয়মে ঠিকাদার নিয়োগ করা হলে মোট বরাদ্দের প্রায় ৩০ শতাংশ অর্থ ঠিকাদারের লভ্যাংশ হিসেবে চলে যেত। সেই অর্থ সাশ্রয় করেই তিনি সরাসরি কাজগুলো সম্পন্ন করেছেন বলে দাবি করা হয়।
তবে সেই সাশ্রয় হওয়া অর্থ তিনি এককভাবে আত্মসাৎ করেছেন—এমন দাবি করাও বাস্তবসম্মত নয়। কারণ সে সময় বিদ্যালয়ে অত্যন্ত প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর একটি ম্যানেজিং কমিটি দায়িত্বে ছিল। সেই কমিটির সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলা কিংবা কোনো অনিয়মের প্রতিবাদ করার সাহস শুধু মফিজুল হকের নয়, পীরগঞ্জ-রানীশংকৈলসহ আশপাশের এলাকার অধিকাংশ মানুষেরও ছিল না। অভিযোগ রয়েছে, ওই ম্যানেজিং কমিটির যোগসাজশে বরাদ্দের একটি বড় অংশ কমিটির প্রভাবশালী সদস্য এবং উন্নয়ন কাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টিত হয়েছে।
যদি ধরে নেওয়া হয় উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ থেকে প্রধান শিক্ষক, ম্যানেজিং কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীরা সবাই আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন, তাহলে তারা সবাই সমানভাবে দায়ী। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে—কেন শুধুমাত্র মফিজুল হককে এককভাবে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে? আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হলে সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে সমানভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?
তবে আমার মূল উদ্বেগ অন্য জায়গায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেই প্রভাবশালী ম্যানেজিং কমিটি আর দায়িত্বে নেই। এরপরও বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ চিত্রে প্রত্যাশিত পরিবর্তন দেখা যায়নি কেন? এখনো কেন পরীক্ষার নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে? সরকারি বেতন-ভাতার বাইরে ‘স্থানীয় পেমেন্ট’-এর নামে শিক্ষকরা প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের অর্থ নিচ্ছেন কেন? বিদ্যালয়ের মার্কেটের দোকানগুলোর ভাড়ার সঠিক হিসাব এখনো কেন জনসম্মুখে আসে না? কেন দিন দিন শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে এবং শিক্ষার মান নিম্নমুখী হচ্ছে?
প্রশাসনিক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত বর্তমান কিংবা পরবর্তী কমিটির আমলেও যদি এসব অনিয়ম বন্ধ না হয়, তাহলে এই দীর্ঘস্থায়ী অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির দায় শেষ পর্যন্ত কার?
এই প্রশ্নের উত্তর একদিন না একদিন দিতেই হবে।
মন্তব্য করুন