ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে গত দুই বছর ধরে চরম বিশৃঙ্খলা ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিদ্যালয়টির তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মফিজুল হককে জোরপূর্বক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর থেকেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে ওই বছরের ২৪ নভেম্বর সাময়িক বরখাস্ত করে। এরপর ওই মহলের সদস্য শাহজালাল সাজু ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই স্থানীয় দুইজন প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবীর ছত্রছায়ায় বিদ্যালয়ে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ৪ একর ৫৫ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির নিজস্ব মার্কেটে ৬৫টি দোকান ও গুদামঘর রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়ম উপেক্ষা করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ কয়েকজন প্রভাবশালী শিক্ষক নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের নামে এসব দোকান বরাদ্দ নিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ীদের বঞ্চিত করছেন এবং ভাড়ার লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করছেন। অভিযোগে আরও বলা হয়, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শাহজালাল সাজুর নিজের নামেই তিনটি দোকান বরাদ্দ রয়েছে। এসব দোকানের ভাড়ার অর্থ আদায় ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের স্বচ্ছতা কিংবা জবাবদিহিতা নেই।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ২০২৩ সালের ৩১ জুলাই জারি করা নীতিমালা অমান্য করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শাহজালাল সাজু নিজ ক্ষমতাবলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নিয়ে ‘লোকাল বেতন’ শিরোনামে বিদ্যালয়ের ফান্ড থেকে প্রায় ১৬ লাখ টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছেন। অথচ প্রভাতি শাখার চাকরিচ্যুত ১০ জন শিক্ষকের বকেয়া বেতন এখনও পরিশোধ করা হয়নি। এছাড়া ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র ফি থেকে ১৫ শতাংশ ভ্যাটের নামে অর্থ আত্মসাৎ, ব্যবহারিক পরীক্ষার আয়ের টাকা যন্ত্রপাতি কেনার অজুহাতে ব্যয় দেখানো এবং পিকনিকের নামে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে মাত্র ৬০ হাজার টাকা খরচ দেখিয়ে বাকি ৮০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
এছাড়াও বিদ্যালয়ের নিজস্ব দোকানঘর এবং অন্যান্য খাত থেকে প্রতি মাসে প্রায় তিন লাখ টাকা আদায় হলেও সেই অর্থের কোনো স্বচ্ছ হিসাব নেই বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তাঁর সহযোগীদের নিয়ে এসব অর্থ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিচ্ছেন। যথাযথ জবাবদিহিতার অভাবে বিদ্যালয়টিকে কার্যত লুটপাটের রাজত্বে পরিণত করা হয়েছে বলেও অভিযোগে বলা হয়েছে।
এসব আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির বিস্তারিত তুলে ধরে চলতি বছরের ৪ মার্চ মুজিবুর রহমান নামে এক ব্যক্তি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগের পর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও চার মাস পার হয়ে গেলেও এখনও তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
এ বিষয়ে পীরগঞ্জে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আরিফুল্লাহ বলেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শাহজালাল সাজুর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রাথমিক কিছু সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন এখনও প্রস্তুত হয়নি।
অন্যদিকে, সাবেক প্রধান শিক্ষক মফিজুল হককে সাময়িক বরখাস্ত করার প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কী দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তা এখনও প্রকাশ করা হয়নি। বরং স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনায় তাঁকে ঠাকুরগাঁও সদরের দুটি রাজনৈতিক মামলায় আসামি করে গ্রেপ্তার করা হয়। ৪৩ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়ে মফিজুল হক বলেন, ‘আমি শিক্ষক মানুষ। আমাকে রাজনৈতিক মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিস্ফোরণ মামলায় আমাকে জেল খাটতে হয়েছে।’
অভিযোগের বিষয়ে পীরগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শাহজালাল সাজু বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে দেওয়া অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি দাবি করেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং সুশৃঙ্খল পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করেছেন। একটি কুচক্রী মহল তাঁর এসব ভালো কাজ মেনে নিতে না পেরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ষড়যন্ত্র করছে।
বিদ্যালয়ের সার্বিক বিষয়ে পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি গোলাম রব্বানী সরদার বলেন, সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দোকানসংক্রান্ত বিষয়গুলো তিনি জানতে পেরেছেন। দোকানের ভাড়ার ফান্ড থেকে শিক্ষকরা পদ-পদবি অনুযায়ী বাড়িভাড়া গ্রহণ করেন, যদিও তাঁরা এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসেবে সরকারিভাবে বেতন পান। বিষয়টি তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহিদুর স্যারকে অবহিত করেছেন। আর সাবেক প্রধান শিক্ষক মফিজুল হকের বিষয়টি বর্তমানে হাইকোর্টে বিচারাধীন থাকায় এ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি।
মন্তব্য করুন