বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৪টায় উপজেলার দেবনগড় ইউনিয়নের মাগুরমারী চৌরাস্তা বাজারে আমজুয়ানি, কনপাড়া, খল্টাপাড়া, খেকিডাঙ্গী, মাগুরমারী চৌরাস্তা ও আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্য, স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন।
ক্বারী আব্দুর রউফ মুন্সি তেঁতুলিয়া উপজেলার দেবনগর ইউনিয়নের আমজুয়ানী গ্রামের মৃত তরিম উদ্দিনের ছেলে। তিনি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
মানববন্ধনে স্থানীয় বাসিন্দারা একজন আলেমকে মারধর, গাছে বেঁধে রেখে নির্যাতন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অপপ্রচারের প্রতিবাদ জানান। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের বিচার দাবি করেন তারা। স্থানীয়দের ভাষ্য, ফেসবুক আইডির মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে যেসব তথ্য প্রচার করা হয়েছে, সেগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মুক্তারুল হক মুকতার বলেন, ‘একজন হুজুর মানুষকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে রশি দিয়ে বেঁধে রাখা—এটা সাধারণ মানুষসহ সবারই খারাপ লাগার কথা। এছাড়া একজন মহিলাকে জোর করে নিয়ে গিয়ে সেখানে রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে বলেও তিনি দেখেছেন। এভাবে কাউকে বেঁধে রেখে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যায় না। একজন আলেম মানুষকে রাস্তা থেকে জোর করে নিয়ে গিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর ও নির্যাতন করা চরম অমানবিক। তিনি এই অমানবিক নির্যাতনের সুবিচার প্রত্যাশা করেন।’
মানববন্ধনে আব্দুর রউফ অভিযোগ করে বলেন, এমদাদুল হকসহ কয়েকজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে তার কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো ও হুমকি দেওয়া হয়। তার অভিযোগ, গত ৩ সেপ্টেম্বর রাতে তাকে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে পুকুরের পানিতে মাথা চেপে ধরে হত্যার চেষ্টা, গলায় ছুরি ঠেকিয়ে হুমকি এবং অপমানজনক ভিডিও ধারণ করা হয়।
ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন রাত আনুমানিক ১১টার দিকে তিনি সাতমোড়া এলাকায় এক ব্যক্তির কাছ থেকে ২ লাখ টাকা ধার নেন। ব্যবসার ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকাসহ মোট ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলে আগে থেকেই সেখানে অবস্থান নেওয়া কয়েকজন তার পথরোধ করেন। এ সময় তাকে মারধর করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম করা হয়। একই সঙ্গে তার সঙ্গে থাকা ব্যাগ থেকে ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, একপর্যায়ে তাকে রাস্তার পাশের একটি পুকুরে ফেলে পানিতে মাথা চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করা হয়। পরে কয়েকজন তাকে টেনে একটি বাড়িতে নিয়ে যান এবং গরু বাঁধার রশি দিয়ে আমগাছের সঙ্গে বেঁধে রাখেন। সেখানে গলায় ধারালো ছুরি ঠেকিয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আব্দুর রউফের অভিযোগ, চাঁদার টাকা না দিলে তাকে হত্যা করে মরদেহ সীমান্ত এলাকায় ফেলে দেওয়া এবং একজন নারীর সঙ্গে আপত্তিকর ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। পরে তার পাগড়ি খুলে ফেলা, দাড়ি টেনে কাদায় মাখিয়ে দেওয়া এবং গলায় জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়। পাশাপাশি একজন নারীকে নিয়ে এসে রশি দিয়ে বেঁধে তার সঙ্গে ভিডিও ধারণ করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
স্থানীয় এক ব্যক্তি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে। পরে অসুস্থ অবস্থায় তাকে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয় বলে জানান ভুক্তভোগী।
আব্দুর রউফ আরও দাবি করেন, ঘটনার পরও অভিযুক্তদের একজন তার কাছে চাঁদার টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে তাকে জুতার মালা পরানো এবং রশি দিয়ে বাঁধা অবস্থার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। তার দাবি, ধারণ করা সেই ভিডিও তানভীর মোহাম্মদ শাকিব নামে একটি ফেসবুক আইডিতে প্রচার করা হয়। পরে বিভিন্ন ফেসবুক আইডি থেকে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও সম্মানহানিকর বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ ঘটনায় আব্দুর রউফ বাদী হয়ে গত ১৫ সেপ্টেম্বর পঞ্চগড় সদর থানায় মামলা করেন। মামলায় এমদাদুল হক (৩৫) কে প্রধান আসামি করা হয়েছে। মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩, ৩৪১, ৩২৩, ৩০৭, ৩৭৯, ৩৮৫, ৩৫৫, ৫০৬, ১১৪ ও ৩৪ ধারাসহ সাইবার সুরক্ষা আইনের ২৫(২) ও ২৭ ধারার অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার এজাহারে অন্য আসামিরা হলেন—সলেমান আলী (২৮), তানভীর মাহামুদ শাকিব (২৫), সাইদুল ওরফে কাসিম (৪০), হাচিনুর (২৫), বাছেদুল (২১), হারুন (২৬), মানিক (২৫), আমিরুল (৩০) ও সামিউল (৩০)। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
আব্দুর রউফ বলেন, তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা চান। একই সঙ্গে তার হারানো অর্থ উদ্ধার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা মিথ্যাচার ও অপপ্রচার চালিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
এ ব্যাপারে পঞ্চগড় সদর থানা পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। মামলার প্রেক্ষিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
Slug:
মন্তব্য করুন