রাজধানীর মিরপুরের বিজয় রাকিন সিটিতে সমিতির কার্যালয় দখল, ভুয়া সদস্য তৈরি, অর্থ আত্মসাৎ ও বৈধ ফ্ল্যাট মালিকদের উচ্ছেদের হুমকির অভিযোগ উঠেছে প্রশাসক আবু ইশতিয়াক আজিজ উলফাতের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধনে হামলা এবং আবাসন প্রকল্পে ভাঙচুর ও মারধরের অভিযোগ করেছেন সমিতির নিবন্ধিত সদস্য ও ফ্ল্যাট মালিকরা। এসব ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং প্রশাসকের অপসারণসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
রাজধানীর মিরপুর ১৫ নম্বরে অবস্থিত বিজয় রাকিন সিটি আবাসন প্রকল্প ও সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধিত মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতি (মুমুপকস) নিয়ে বিরোধ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। সমিতির নিবন্ধিত সদস্য ও বৈধ ফ্ল্যাট মালিকদের অভিযোগ, প্রশাসক নিয়োগের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ, কার্যালয় দখল এবং বহিরাগতদের মাধ্যমে ফ্ল্যাট দখলের চেষ্টা চলছে।
সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৯৭ সালে নিবন্ধিত এ সমিতি ও আবাসন প্রকল্প কোনো সরকারি অনুদান বা সরকারি বাজেটের অর্থে গড়ে ওঠেনি। নিবন্ধিত বীর মুক্তিযোদ্ধা, তাঁদের পরিবার এবং বৈধ ফ্ল্যাট মালিকদের নিজস্ব অর্থায়ন ও সঞ্চয়ের মাধ্যমে প্রকল্পটি গড়ে তোলা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রশাসক হিসেবে আবু ইশতিয়াক আজিজ উলফাত দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সমিতির কার্যক্রমে নানা অনিয়ম শুরু হয়। তাঁদের অভিযোগ, তিনি এর আগে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) থেকে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অর্থসংক্রান্ত অভিযোগে অপসারিত হয়েছিলেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সমিতির সদস্যদের অভিযোগ, দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রশাসক বহিরাগত লোকজন নিয়ে সমিতির মূল কার্যালয় দখল করেন। পাশাপাশি প্রকৃত ও নিবন্ধিত সদস্যদের বাদ দিয়ে বহিরাগতদের নতুন সদস্য করার চেষ্টা চলছে। এসব ব্যক্তিকে ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাঁদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়। একই সঙ্গে সমিতির নিজস্ব সঞ্চিত তহবিলের বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও তুলেছেন তাঁরা।
অভিযোগকারীরা আরও জানান, বৈধ ফ্ল্যাট মালিকদের বাদ দিয়ে বহিরাগতদের ফ্ল্যাটে বসানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সমিতির কার্যালয় দখলে রাখা হয়েছে। এ কাজে বহিরাগত ভাড়াটে লোকজন ব্যবহার করে আবাসন প্রকল্পে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
বৈধ দলিল, নিবন্ধিত বণ্টননামা ও নামজারির মাধ্যমে মালিকানা অর্জন করে নিয়মিত সরকারি খাজনা পরিশোধকারী ফ্ল্যাট মালিকদের উচ্ছেদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, আদালতের কোনো নির্দেশনা ছাড়াই বহিরাগতদের মাধ্যমে ফ্ল্যাট মালিক ও প্রবীণ বাসিন্দাদের হয়রানি করা হচ্ছে। অনিয়মের প্রতিবাদ করায় কয়েকজন সদস্য শারীরিক আক্রমণের শিকার হয়েছেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
প্রশাসকের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের প্রতিবাদে এবং প্রকৃত ঘটনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনতে গত ৩১ অক্টোবর ২০২৬ জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধনের আয়োজন করেন সমিতির নিবন্ধিত ফ্ল্যাট মালিক ও সদস্যরা।
তাঁদের অভিযোগ, কর্মসূচি চলাকালে প্রশাসকের পক্ষের বহিরাগত লোকজন সেখানে হামলা চালায়। এ সময় প্রবীণ বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সমিতির সদস্যদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে কর্মসূচিস্থল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
একই সময়ে বিজয় রাকিন সিটি আবাসন প্রকল্পের ভেতরেও হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। রাকিন ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি (বিডি) লিমিটেডের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) রাশিদুল এবং মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আবুল কালামের প্রত্যক্ষ ইশারা ও প্ররোচনায় অপু রহমান, আব্দুল মমিন, শামিম, পিজুস, রেজাউল ও সজলসহ প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জন বহিরাগত প্রকল্পে প্রবেশ করেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন।
তাঁদের অভিযোগ, ওই ব্যক্তিরা নিরাপত্তাকর্মীদের মারধর করেন এবং সাবল দিয়ে ভবনের প্রধান ফটকের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। পরে ফ্ল্যাট মালিক ও বাসিন্দাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এ সময় কামরুল হাসানসহ কয়েকজনকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ফ্ল্যাট মালিক কামরুল হাসান বাদী হয়ে কাফরুল থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এ বিষয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানায়, ঘটনার তদন্ত চলছে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ঘটনায় জড়িত কাউকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে প্রশাসক আবু ইশতিয়াক আজিজ উলফাতের বক্তব্য জানতে সরাসরি ও টেলিফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমিতির কার্যালয়ে গিয়ে প্রশাসকের পরিবর্তে আমির আলী নামে এক ব্যক্তির দেখা পাওয়া যায়। তিনি নিজেকে প্রশাসকের ব্যবস্থাপক বলে পরিচয় দেন। তবে দুর্নীতির অভিযোগ ও কার্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জরুরি কাজের কথা বলে তিনি সেখান থেকে চলে যান এবং কোনো বক্তব্য দেননি।
সমিতির একাধিক নিবন্ধিত ফ্ল্যাট মালিক ও স্থায়ী সদস্যের অভিযোগ, আমির আলী জামুকা থেকে অপসারিত এবং তিনি সমিতির কোনো সময়ের কর্মকর্তা, কর্মচারী কিংবা নিবন্ধিত সদস্য ছিলেন না। তাঁদের দাবি, বহিরাগত হওয়া সত্ত্বেও তিনি সমিতির কার্যালয়ে অবস্থান করছেন এবং প্রশাসকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন অনিয়মে সহযোগিতা করছেন। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন তাঁরা।
এ পরিস্থিতিতে সমিতির নিবন্ধিত ফ্ল্যাট মালিকদের আবাসন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সঞ্চিত তহবিল উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন সদস্যরা।
তাঁদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—জামুকা থেকে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অর্থসংক্রান্ত অভিযোগে অপসারিত হওয়ার দাবি করা প্রশাসক আবু ইশতিয়াক আজিজ উলফাতকে অবিলম্বে বরখাস্ত ও অপসারণ; বহিরাগতদের সরিয়ে সমিতির দখলকৃত কার্যালয় উদ্ধার করে প্রকৃত নিবন্ধিত সদস্যদের কাছে হস্তান্তর; ভুয়া সদস্য তৈরি, অর্থ আদায় ও তহবিল তছরুপের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ।
এ ছাড়া প্রতিবাদী ফ্ল্যাট মালিকদের বিরুদ্ধে করা মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার এবং বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় প্রেস ক্লাব ও আবাসন প্রকল্পে হামলার ঘটনায় প্রবীণ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।