নিরাপদ আবাসন, উন্নত নাগরিক সেবা, সড়ক নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন লেখক ও সমাজসেবক লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল। তাঁর মতে, পরিকল্পিত নগর উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
৩১ অক্টোবর বিশ্ব নগর দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘শহরের পুনর্জাগরণ: সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন’। এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে নগর উন্নয়নে আবাসন, পরিবহন, নাগরিক সেবা ও পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল।
এক নিবন্ধে তিনি বলেন, নগর উন্নয়ন শুধু কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ সৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিরাপদ বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানি, চলাচলের সুবিধা এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নগর পরিকল্পনা ও সেবার সুফল মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছাচ্ছে, বিশ্ব নগর দিবসে তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণের ফলে আবাসন, কর্মসংস্থান, পরিবহন, পানি সরবরাহ ও নাগরিক সেবার ওপর চাপ বাড়ছে। ঢাকা ছাড়াও দেশের বড় শহর, জেলা শহর ও পৌর এলাকাগুলোতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, পরিকল্পনা প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ, ভূমির যথাযথ ব্যবহার এবং জনসংখ্যার অনুপাতে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে। নির্মাণাধীন ভবনে অনিয়ম শনাক্ত ও প্রতিরোধে নিয়মিত পরিদর্শন এবং আইন প্রয়োগ জরুরি। ভবন নির্মাণের অনুমোদন, নকশা, পরিদর্শন ও ব্যবহার-অনুমতির তথ্য নাগরিকদের যাচাইয়ের উপযোগী করে প্রকাশের ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবনের কাঠামোগত ও অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি নির্গমনপথ এবং সড়কের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। গুরুতর অনিয়মের ক্ষেত্রে নির্মাণ বন্ধ, সংশোধনের নির্দেশনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের ব্যবহার সীমিত করার মতো ব্যবস্থা কার্যকর করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে নির্মাতা ও তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
সড়ক নিরাপত্তা প্রসঙ্গে লায়ন গনি মিয়া বাবুল বলেন, সড়ক পরিকল্পনায় শুধু যানবাহনের চলাচল বিবেচনা করলে পথচারী, শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও গণপরিবহনের যাত্রীদের প্রয়োজন উপেক্ষিত হয়। নিরাপদ ফুটপাত, পারাপারের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত সড়কবাতি, পরিকল্পিত বাসস্টপ এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে চালকের আচরণের পাশাপাশি সড়কের নকশা, ফুটপাতের ঘাটতি, ঝুঁকিপূর্ণ মোড় এবং নিরাপদ পারাপারের অভাব বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। নতুন ও পুরোনো সড়কের নিরাপত্তা নিরীক্ষা, দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান সংস্কার এবং দুর্ঘটনার তথ্য নিয়মিত প্রকাশের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন তিনি।
ঢাকার যানজট নিরসনে শুধু সড়ক প্রশস্ত করা বা উড়ালপথ নির্মাণ যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা, পরিকল্পিত বাসস্টপ ও পার্কিং এবং নিরাপদ হাঁটার পথ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। নতুন আবাসন, শিল্পাঞ্চল ও বাণিজ্যকেন্দ্র অনুমোদনের আগে পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা পূরণের পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জলাবদ্ধতা ও জলাশয় সংরক্ষণের বিষয়ে তিনি বলেন, খাল, জলাধার, বন্যাপ্রবাহ এলাকা এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনপথ রক্ষা না করে টেকসই নগর উন্নয়ন সম্ভব নয়। খাল পুনরুদ্ধার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পয়ঃবর্জ্য শোধন এবং পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশনব্যবস্থাকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণকেও নগর জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন লায়ন গনি মিয়া বাবুল। নির্মাণস্থলে ধুলা নিয়ন্ত্রণ, যানবাহন ও শিল্পকারখানার নিঃসরণ পর্যবেক্ষণ, শব্দদূষণের নিয়ম প্রয়োগ এবং দূষণসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নগরের গাছপালা, পার্ক, খেলার মাঠ, পুকুর ও জলাভূমি সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এসব উন্মুক্ত স্থান তাপমাত্রা কমানো, বৃষ্টির পানি ধারণ এবং মানুষের সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। পাশাপাশি ছায়াযুক্ত হাঁটার পথ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় জনসচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্ব নগর দিবসের প্রতিপাদ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সবার জন্য সাশ্রয়ী ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তাঁর মতে, নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসন সমস্যা সমাধানে শুধু উচ্ছেদ নয়, বরং নিরাপদ পানি, বিদ্যুৎ, পয়ঃনিষ্কাশন, সাশ্রয়ী ভাড়া এবং জীবিকা ও প্রয়োজনীয় সেবায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নগর পুনর্জাগরণের অংশ হিসেবে বিদ্যমান বাসিন্দাদের অধিকার ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
নগর উন্নয়নে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জোরদারের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সমন্বয়ে জাতীয় নগর কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা যেতে পারে। এতে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সংস্থা, সড়ক ও পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করতে হবে। পাশাপাশি বাজেট, সময়সীমা, পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য ও অগ্রগতির প্রতিবেদন নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন।
পরিকল্পনা প্রণয়নে নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ওয়ার্ডভিত্তিক আলোচনায় নারী, শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, নিম্ন আয়ের বাসিন্দা, পথচারী, গণপরিবহনের যাত্রী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মতামত নিতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্প শুরুর আগে পরিবেশ, সড়ক নিরাপত্তা, পানি, জীবিকা ও স্থানচ্যুতির সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করে তা প্রকাশ করাও জরুরি।
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুলের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ রোধে সরকার, নগর পরিকল্পনাবিদ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা, আইনের কার্যকর প্রয়োগ, পরিবেশ সংরক্ষণ, পর্যাপ্ত আবাসন এবং উন্নত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই বাসযোগ্য, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব নগর গড়ে তোলা সম্ভব।
লেখক পরিচিতি:
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক। তিনি বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির (কৃষি) কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্মমহাসচিব।
মন্তব্য করুন