গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে সাংবাদিকতার মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত। সত্য অনুসন্ধান এবং জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশই এ পেশার প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু তথাকথিত সাংবাদিকের কর্মকাণ্ডে এই সম্মানজনক পেশা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। দিনের পর দিন একই সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করেও কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ না করায় তাদের ভূমিকা নিয়ে জনমনে সন্দেহ ও সমালোচনা বাড়ছে।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এই তথাকথিত 'ঘুর ঘুর পার্টি'র কার্যক্রম মূলত তিনটি ধরণে পরিচালিত হয়, যা সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও পেশাগত মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কিছু ব্যক্তি কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত যাতায়াত করেন তথ্য সংগ্রহের জন্য নয়; বরং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) কিংবা ঠিকাদারদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে। ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায় বা বিজ্ঞাপন সংগ্রহের মতো বাণিজ্যিক স্বার্থে সেই সম্পর্ককে কাজে লাগানোই তাদের মূল লক্ষ্য। অনেক গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন সংগ্রহের চাপও এ ধরনের প্রবণতাকে উৎসাহিত করে।
এই অসাধু চক্রের সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো সংবাদ প্রকাশের পরিবর্তে সেটিকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। পরিচয়পত্র দেখিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে অনিয়মের তথ্য সংগ্রহ করা হলেও তা প্রকাশের পরিবর্তে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর অভিযোগ রয়েছে। সাংবাদিকতার ভাষায় যাকে অনেকেই 'নিউজ না করে নিউজ খাওয়া' বলে অভিহিত করেন। দিনের মধ্যে একাধিকবার একই অফিসে যাওয়ার পেছনেও এমন চাপ বজায় রাখার উদ্দেশ্য কাজ করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরেক শ্রেণীর ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে বদলি, টেন্ডার, লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়া কিংবা আটকে থাকা ফাইল ছাড়ানোর মতো বিভিন্ন তদবিরে জড়িয়ে পড়েন। এতে সাংবাদিকতার পরিচয়কে প্রভাব খাটানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অনেক সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও অপ্রয়োজনীয় জটিলতা এড়াতে তাদের দাবির কাছে নতি স্বীকার করেন। এতে ব্যক্তি বিশেষ লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনস্বার্থ এবং রাষ্ট্রীয় সুশাসন।
একজন প্রকৃত অনুসন্ধানী সাংবাদিক তথ্যের প্রয়োজনেই কোনো প্রতিষ্ঠানে যান। তিনি বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করেন, প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করেন এবং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ভীকভাবে সংবাদ প্রকাশ করেন। বড় কোনো দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশের পর সেই সাংবাদিকের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করাই অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। বিপরীতে, যারা সংবাদ প্রকাশের পরিবর্তে শুধু নিয়মিত যাতায়াত করেন, তাদের অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানের ভেতরে স্বাচ্ছন্দ্যে গ্রহণ করা হয়। কারণ তারা সংবাদ প্রকাশের চেয়ে অন্য উদ্দেশ্যেই বেশি সক্রিয়—এমন ধারণা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তৈরি হয়।
"নিউজ করার জন্য অফিসে বারবার যেতে হয় না, নিউজ না করার জন্য বারবার যেতে হয়।"
তবে এটিও সমানভাবে সত্য যে, সবাই এক রকম নন। এখনও বহু সাহসী ও পেশাদার সাংবাদিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে চলেছেন। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো সাংবাদিকতা পেশাই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। তাই গণমাধ্যম মালিকদের উচিত কর্মীদের পেশাগত আচরণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
মন্তব্য করুন