চীনে প্রথমবারের মতো শিশুদের তুলনায় প্রবীণ নির্ভরশীলতার হার বেশি হয়েছে। ২০২৫ সালে প্রবীণ নির্ভরশীলতার হার দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ১ শতাংশে, যেখানে শিশু নির্ভরশীলতার হার ২২ শতাংশ। এতে প্রবীণদের পরিচর্যা ও সামাজিক নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ বাড়লেও নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
চীনের জনসংখ্যার কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো দেশটিতে শিশুদের তুলনায় প্রবীণ নির্ভরশীলতার হার বেশি হয়েছে। এতে বয়স্ক মানুষের পরিচর্যা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ বাড়লেও প্রবীণদের ঘিরে নতুন শিল্প ও ব্যবসার বিকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত ‘চায়না স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইয়ারবুক ২০২৬’-এর তথ্যের বরাতে দেশটির সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস এ খবর জানিয়েছে। অর্থবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ইয়িকাই ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীনে প্রবীণ নির্ভরশীলতার হার ছিল ২৩ দশমিক ১ শতাংশ। একই সময়ে শিশু নির্ভরশীলতার হার ছিল ২২ শতাংশ।
প্রবীণ জনসংখ্যা বাড়ছে, কমছে শিশুদের অনুপাত
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীনে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজারে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে, শূন্য থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ছিল ২১ কোটি ২৭ লাখ ৬০ হাজার। মোট জনসংখ্যায় তাদের অনুপাত ১৫ দশমিক ১ শতাংশ। ওই বছর দেশটির মোট নির্ভরশীলতার হার ছিল ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ।
কর্মক্ষম বয়সের জনগোষ্ঠীর তুলনায় কর্মক্ষম বয়সের বাইরের মানুষের অনুপাতকে নির্ভরশীলতার হার বলা হয়। চীনে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
দেশটিতে প্রবীণ নির্ভরশীলতার হার কয়েক বছর ধরেই বাড়ছে। ২০১৬ সালে এ হার ছিল ১৫ শতাংশ, যা ২০২১ সালে বেড়ে ২০ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০২৪ সালে প্রবীণ নির্ভরশীলতার হার ছিল ২২ দশমিক ৮ শতাংশ। সে বছর শিশু নির্ভরশীলতার হার ছিল ২৩ শতাংশ। পরের বছরই প্রথমবারের মতো শিশুদের ছাড়িয়ে যায় প্রবীণ নির্ভরশীলতার হার।
প্রবীণদের ঘিরে বাড়ছে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
স্বাধীন জনসংখ্যাবিশেষজ্ঞ হে ইয়াফু গ্লোবাল টাইমসকে বলেন, প্রবীণ নির্ভরশীলতার হার শিশুদের ছাড়িয়ে যাওয়া চীনের জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এর ফলে বয়স্ক মানুষের পরিচর্যার চাহিদা বাড়বে। একই সঙ্গে প্রবীণদের সেবাকেন্দ্রিক শিল্প এবং ‘সিলভার ইকোনমি’ বা প্রবীণদের ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনীতির বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে।
তাঁর মতে, উন্নত দেশগুলোর তুলনায় চীনে জনসংখ্যার বার্ধক্য দ্রুত বাড়ছে। তবে দেশটির শক্তিশালী উৎপাদন ও সেবাব্যবস্থা বাড়তি চাহিদাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
২০২৫ সালে চীনের সিলভার ইকোনমির আকার প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছেছে, যা প্রায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। ফলে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা, পরিচর্যা, আবাসন এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের উপযোগী পণ্য ও সেবার বাজার ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে।
বাড়িতে পরিচর্যা, বদলাচ্ছে আবাসনব্যবস্থা
হে ইয়াফুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চীনের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রবীণ বাড়িতে থেকেই পরিচর্যা পান। এ কারণে তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়িঘর উপযোগী করে তোলার চাহিদা বাড়ছে। এর মধ্যে লিফট স্থাপন, বাথরুমে পিচ্ছিল প্রতিরোধী ব্যবস্থা, চলাচলের সুবিধার্থে হাতল এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা চাওয়ার ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে প্রবীণদের দেখাশোনার ঐতিহ্য এবং বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা চীনের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিমা ও সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থাও প্রবীণদের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখছে। তবে জনসংখ্যার বার্ধক্য মোকাবিলায় এসব ব্যবস্থার আরও উন্নয়ন প্রয়োজন।
পেনশন ও পরিচর্যাসেবায় জোর
২০২৬-২০৩০ মেয়াদের চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জনসংখ্যার বার্ধক্য মোকাবিলাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনায় শহর ও গ্রামে প্রবীণদের সেবাব্যবস্থার উন্নয়ন, সিলভার ইকোনমির বিকাশ, প্রবীণদের শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং তাঁদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে চীনের জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশন, বেসামরিক বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন প্রবীণদের সেবার মূল্য নির্ধারণব্যবস্থা উন্নত করতে যৌথ নির্দেশিকা প্রকাশ করে। এর উদ্দেশ্য মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সাশ্রয়ী ও মানসম্মত পরিচর্যাসেবা নিশ্চিত করা।
হে ইয়াফুর মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় চীনের বহুস্তরবিশিষ্ট পেনশনব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা বিমাব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং গ্রামীণ এলাকায় প্রবীণদের সেবার ঘাটতি কমানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
অন্যদিকে, জন্মহার কমে যাওয়াও চীনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পরিবারগুলোকে সন্তান নিতে উৎসাহিত করতে শিশু পরিচর্যায় ভর্তুকি ও অন্যান্য সুবিধা বাড়ানো এবং সাশ্রয়ী শিশু পরিচর্যাসেবা সম্প্রসারণের পরামর্শ দিয়েছেন এই জনসংখ্যাবিশেষজ্ঞ।
সব মিলিয়ে, চীনের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন একদিকে প্রবীণদের পরিচর্যা ও সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্ভাবনাও বাড়াচ্ছে। প্রবীণদের কল্যাণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি তরুণ পরিবারগুলোকে সন্তান নিতে উৎসাহিত করা এখন দেশটির নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
তথ্যসূত্র: গ্লোবাল টাইমস
মন্তব্য করুন