তবে সেই কারখানায় এখন আগের মতো শ্রমিকের প্রয়োজন হচ্ছে না। অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), আবাসন খাতের দীর্ঘস্থায়ী মন্দা এবং উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তনে একদিকে কর্মীরা চাকরি হারাচ্ছেন, অন্যদিকে রেকর্ডসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক চাকরির বাজারে প্রবেশ করেও প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না।
মাত্র দুই সপ্তাহ আগে পূর্ব চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের ঘটনা দেশজুড়ে এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
চীনের অন্যতম বড় গাড়ির যন্ত্রাংশ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান চ্যাংঝো শিংইউ অটোমোটিভ লাইটিং চলতি বছর ৪৪০ জন নতুন স্নাতককে নিয়োগ দেয়। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাদের মধ্যে ১০৭ জনকে ছাঁটাই করা হয়। কোনও আগাম সতর্কতা ছাড়াই তাদের সামনে দুটি বিকল্প রাখা হয়—সামান্য ক্ষতিপূরণ নিয়ে চাকরি ছেড়ে দেওয়া অথবা কারখানার উৎপাদন বিভাগে চলে যাওয়া।
ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো হস্তক্ষেপ করে। পরে প্রতিষ্ঠানটি ‘ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা ও সহানুভূতির ঘাটতি’র কথা স্বীকার করে এবং মানবসম্পদ বিভাগের পরিচালককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে।
তবে কয়েক দিন পরই প্রতিষ্ঠানটি জানায়, বছরের প্রথমার্ধে তাদের আয় প্রায় ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে ৫ কোটি ৬৬ লাখ ইউয়ান লভ্যাংশ দেওয়ার অনুমোদনও দেওয়া হয়। অর্থাৎ চাকরি হারানো তরুণ স্নাতকদের হাতে গেল ক্ষতিপূরণের অর্থ, আর শেয়ারহোল্ডাররা পেলেন লভ্যাংশ।
ঘটনাটি চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। কারণ এটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের শ্রমনীতি নিয়ে বিতর্ক ছিল না; অনেকের কাছে এটি দেশের চাকরির বাজারের গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
একটি প্রতিষ্ঠানের ঘটনা থেকে পুরো চীনের শ্রমবাজারের দিকে তাকালে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে।
চলতি বছর চীনের কর্মবাজারে প্রবেশ করেছে রেকর্ড ১ কোটি ২৭ লাখ বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক। দেশটির ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় স্নাতক ব্যাচ।
অন্যদিকে, ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের বেকারত্বের হার মে মাসে ছিল ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সময়ে তাদের চেয়ে মাত্র কয়েক বছর বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর বেকারত্বের তুলনায় এই হার ছিল দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে লাখ লাখ তরুণ একের পর এক চাকরির আবেদন করলেও অনেক ক্ষেত্রে কোনও সাড়া পাচ্ছেন না।
তবে সমস্যা শুধু নতুন স্নাতকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যে শ্রমজীবী মানুষের ওপর দাঁড়িয়ে চীনের শিল্প ও উৎপাদন অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল, তারাও এখন ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
চীনের নীল-কলার শ্রমিকদের কর্মসংস্থান কমার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে কারখানায় দ্রুত অটোমেশন চালু, তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয়ের দেশগুলোতে উৎপাদন স্থানান্তর এবং আবাসন খাতের দীর্ঘস্থায়ী সংকট অন্যতম।
বিশেষ করে আবাসন খাতের ধস নির্মাণশিল্পে ব্যাপক কর্মসংস্থান কমিয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চীনের নির্মাণ খাত থেকে ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি শ্রমিক বেরিয়ে গেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সময়ে স্থায়ী চাকরির বিকল্প হিসেবে গিগ বা চুক্তিভিত্তিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। চলতি বছর চীনে গিগ কর্মীর সংখ্যা ৩২ কোটিতে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত বছর এই সংখ্যা ছিল প্রায় ২৮ কোটি।
অর্থাৎ নিয়মিত ও স্থায়ী চাকরি যে হারে কমছে, সেই হারে বিকল্প স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।
চীনের কর্মসংস্থান সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো শিক্ষিত তরুণদের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও তাদের জন্য উপযুক্ত চাকরি তৈরি হচ্ছে না।
গত এক দশকে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী তৈরি করেছে। কিন্তু স্নাতকের সংখ্যা যে গতিতে বেড়েছে, বিশেষ করে অফিসভিত্তিক ও সাদা-কলারের চাকরি সেই অনুপাতে বাড়েনি। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।
প্রবেশপর্যায়ের যেসব চাকরি একসময় বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের কর্মজীবনের শুরুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত, সেগুলোর কিছু এখন এআই ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পর চাকরি পাওয়া তরুণদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
চীনের সরকার বিষয়টি উপলব্ধি করছে এবং শ্রমবাজারের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার সামঞ্জস্য আনতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে।
বেইজিং ইতোমধ্যে হাজার হাজার ‘অপ্রচলিত’ বিশ্ববিদ্যালয় প্রোগ্রাম বন্ধ বা পুনর্গঠন করেছে। এর মধ্যে মানবিক ও কিছু প্রচলিত বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ কমিয়ে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নতুন স্নাতকদের জন্য ছয় মাসব্যাপী জাতীয় নিয়োগ কর্মসূচিও চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি চলতি বছর এআই প্রযুক্তির সহায়তায় ১ কোটি ২০ লাখ নগরভিত্তিক চাকরি তৈরির পরিকল্পনাও সামনে আনা হয়েছে।
তবে এসব উদ্যোগ দেশটির বিশাল কর্মসংস্থান সংকটের তুলনায় কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের এক গবেষকের মতে, চীনের কর্মসংস্থান সংকট ২০২০ সাল থেকেই একটি স্থায়ী সমস্যা হিসেবে রয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
চীনের কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যা কমছে বলেই যে দেশটির উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাচ্ছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়।
গ্র্যান্ট থর্নটন ভারত-এর পার্টনার ও ইকোনমিক অ্যাডভাইজরি লিড ঋষি শাহ মনে করেন, চাকরি হারানোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের সময় সতর্ক থাকা জরুরি। বিশেষ করে চীনের উৎপাদন খাতের সঙ্গে ভারতের সম্ভাবনা তুলনার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, অরগানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) গবেষণা অনুযায়ী, চীনের উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান ২০১৩ সালে সর্বোচ্চ প্রায় ১৫ কোটি ২০ লাখে পৌঁছেছিল। এরপর তা কমে প্রায় ১৩ কোটি ৪০ লাখে নেমেছে। অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ বা ১২ শতাংশ কর্মসংস্থান কমেছে।
কিন্তু ঋষি শাহের মতে, মূল প্রশ্ন হলো—এই পতনের কারণ কী?
এটি কি উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ার ফল, নাকি অন্য দেশে চাকরি স্থানান্তরের কারণে এমন হয়েছে? অথবা চীন কি ইচ্ছাকৃতভাবে আরও বেশি উৎপাদনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে?
তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রমাণ দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটিকেই বেশি সমর্থন করে।
চীনের উৎপাদন খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে—কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যা কমলেও বিশ্বব্যাপী উৎপাদিত পণ্যের বাজারে চীনের অংশ কমেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা বেড়েছে।
এর অর্থ হলো, কম শ্রমিক দিয়েই আগের তুলনায় বেশি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।
ঋষি শাহের ভাষায়, বেশি উৎপাদন কিন্তু কম শ্রমিক—এই সমীকরণ মূলত শিল্পের পতন নয়, বরং অটোমেশনের লক্ষণ।
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সরবরাহ শৃঙ্খল বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা চীনের উৎপাদন কর্মসংস্থান কমাতে কিছুটা ভূমিকা রেখেছে। তবে এটিকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না বলে তিনি মনে করেন।
চীনের উৎপাদন খাতে পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের অন্যান্য দেশ, বিশেষ করে ভারতের জন্য কিছু সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ভারত ইতোমধ্যে চীনের কিছু উৎপাদন কার্যক্রম নিজেদের দেশে আনার চেষ্টা করছে। সরকারের প্রোডাকশন-লিঙ্কড ইনসেনটিভ (পিএলআই) কর্মসূচি এর অন্যতম প্রধান উদ্যোগ।
ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত পিএলআই প্রকল্পগুলো প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি করেছে এবং প্রায় ২ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন রুপি বা আনুমানিক ২৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে।
তবে এটিকে এখনই চীনের বিকল্প হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন ঋষি শাহ।
তার মতে, শুধু পণ্য সংযোজন বা অ্যাসেম্বলি কাজ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থায় শক্ত অবস্থান তৈরি করা সম্ভব নয়। ভারতকে উৎপাদনের পাশাপাশি যন্ত্রাংশ, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনেও এগিয়ে যেতে হবে।
মান, উদ্ভাবন এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের গভীরতার ক্ষেত্রেও ভারতের আরও উন্নতি প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
গত চার দশকে চীন কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে এনে শিল্প ও উৎপাদন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে। সেই শ্রমশক্তিই চীনকে বিশ্বের কারখানায় পরিণত করার অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল।
কিন্তু এখন সেই মডেল দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
কারখানায় রোবট ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অফিসের প্রবেশপর্যায়ের কিছু কাজের জায়গা দখল করছে। আবাসন খাতের সংকটে নির্মাণকাজ কমেছে। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আসছে আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি সংখ্যক তরুণ।
ফলে চীনের সামনে এখন এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা—দেশটির অর্থনীতি এখনও বড়, উৎপাদনও চলছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য সাধারণ চাকরি তৈরি করার সক্ষমতা আগের মতো নেই।
শিংইউয়ের চাকরি হারানো স্নাতকেরা তাই কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনার শিকার নন। তারা একটি বৃহত্তর পরিবর্তনেরই লক্ষণ।
সাবেক ফক্সকন কর্মীর অল্প পারিশ্রমিকে খাবার সরবরাহের কাজ করা কিংবা নির্মাণশ্রমিকের নিজের সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলে আগের নিয়োগকর্তার চেয়ে বেশি অর্থ দেওয়া—এসব ঘটনাও একই বাস্তবতার অংশ।
চীনের নেতৃত্ব বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। গিগ কর্মীদের সুরক্ষা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এবং স্নাতকদের জন্য নিয়োগ কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তব বাজেট ও ব্যয়ের চিত্র বলছে, সমস্যার মাত্রার তুলনায় এখনও যথেষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
অর্থাৎ চীন হয়তো তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা হারাচ্ছে না; বরং দ্রুত বদলে যাওয়া অর্থনীতিতে ‘সাধারণ মানুষের জন্য সাধারণ চাকরি’ তৈরি করাই এখন দেশটির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: এনডিটিভি
মন্তব্য করুন