চাকরির আড়ালে ঠিকাদারি কাজ করা, উপজেলা প্রকৌশলীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিয়মিত অফিসে অনুপস্থিত থাকা এবং অফিসে না গিয়েও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করার অভিযোগ উঠেছে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলা এলজিইডি অফিসের কমিউনিটি অর্গানাইজার (সিও) রেজাওয়ানুল ইসলাম রেজার বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, অগ্রিম তারিখে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে, কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একই সময়ে পার্টটাইম ভিত্তিতে চ্যানেল ২৪–এ কাজ করতেন। সেই পরিচয় ব্যবহার করে সাংবাদিক পরিচয়ে দাম্ভিকতা দেখানো এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে উপজেলা প্রকৌশলীকে উপেক্ষা করে দীর্ঘদিন অফিসে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, তার এই কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেন একই অফিসের জাইকা প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী রিমন হোসেন। প্রতিদিন রেজার পরিবর্তে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন তিনি। উপজেলা প্রকৌশলী অফিসের দুই কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জাইকার সহকারী প্রকৌশলী রিমন হোসেন নিয়মিত রেজাওয়ানুল ইসলাম রেজার পরিবর্তে হাজিরা খাতায় অগ্রিম স্বাক্ষর করেন। তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও রিমন হোসেন কল রিসিভ করেননি।
গত ঈদুল আজহার আগ থেকেই সিও রেজাওয়ানুল ইসলাম রেজা অফিসে অনুপস্থিত রয়েছেন—এমন অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে গত ১৭ জুন বেলা ১২টার দিকে সরেজমিনে উপজেলা প্রকৌশলী অফিসে গিয়ে হাজিরা খাতা পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে তার স্বাক্ষরের পাশাপাশি পরদিনের তারিখেও অগ্রিম স্বাক্ষর পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা প্রকৌশলী জাকির হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি সিও রেজাকে ফোন করেন। তখন রেজা নিজেকে সাতক্ষীরায় অবস্থান করছেন বলে জানান। পরদিন তাকে অফিসে ডেকে উপস্থিত প্রতিবেদকের সামনে অফিসে না এসে হাজিরা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকলেও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর তিনি নিজেই করেছেন। অভিযোগের সত্যতা জানার পরও উপজেলা প্রকৌশলী কোনো ব্যবস্থা নেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে তার ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
এক সময়ের ছাত্রলীগ কর্মী রেজাওয়ানুল ইসলাম রেজা গত ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুল ইসলামের নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অফিসে অনুপস্থিত থাকা ছাড়াও তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। একাধিক সূত্র জানায়, মাস শেষে শুধু এলসিএস (লেবার কনস্ট্রাক্টিং সোসাইটি) কর্মীদের বেতন তৈরির সময় অফিসে উপস্থিত থাকেন তিনি।
এলসিএসের কয়েকজন নারী কর্মী চাকরি হারানোর আশঙ্কায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাদের সঙ্গে অসদাচরণ করা হয়েছে এবং চাকরি হারানোর ভয় দেখিয়ে ব্যাংক হিসাব খোলার কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকে তিন থেকে চার হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রতি মাসে বেতন দেওয়ার সময় অনেকের কাছ থেকে অতিরিক্ত উপঢৌকন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিও রেজাওয়ানুল ইসলাম রেজা তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে অফিসে উপস্থিত না থেকেও হাজিরা খাতায় নিজেই স্বাক্ষর করেছেন বলে তিনি দাবি করেন। এলসিএস কর্মীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।
সরকারি চাকরির আচরণবিধি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিত থেকে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করা বাধ্যতামূলক। এর ব্যত্যয় ঘটলে তা অবহেলা ও অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হয়। এ ধরনের ঘটনায় তদন্ত সাপেক্ষে কারণ দর্শানোর নোটিশ, সাময়িক বরখাস্ত, বদলি, বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত থাকার দিনের বেতন কর্তনসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। তদন্ত শেষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানোরও নিয়ম রয়েছে। তবে উপজেলা প্রকৌশলী জাকির হোসেন এখনো কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তার ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী জাকির হোসেন বলেন, “বিষয়টি তদন্ত করে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।”
মন্তব্য করুন