অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Nov 3, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন: লায়ন গনি মিয়া বাবুল

শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিয়মিত বেতন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, চিকিৎসাসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার ও মালিকপক্ষকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল। তিনি শ্রমিকের অধিকারকে দয়া বা অনুগ্রহ নয়, বরং ন্যায্য পাওনা হিসেবে প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

শ্রমিকরা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাঁদের শ্রমের ওপর নির্ভর করে শিল্পকারখানা, নির্মাণ, পরিবহন, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিভিন্ন সেবাখাতের কার্যক্রম সচল থাকে। কিন্তু অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও কল্যাণ যথাযথ গুরুত্ব পায় না। তাই শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করেন লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল।

তিনি বলেন, শ্রমিকের অধিকার শুধু মাস শেষে বেতন পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ন্যায্য মজুরি, নিয়মিত বেতন, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, চিকিৎসাসেবা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, ছুটি, বকেয়া পাওনা পরিশোধ এবং অভিযোগ জানানোর সুযোগও শ্রমিকের মৌলিক অধিকারের অংশ। এসব অধিকার কেবল নীতিমালায় সীমাবদ্ধ না রেখে কর্মক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করতে হবে।

শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় দিন দিন বাড়ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য, বাড়িভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার খরচ সামাল দিতে সীমিত আয়ের শ্রমজীবী মানুষকে হিমশিম খেতে হয়। নির্ধারিত মজুরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে তাঁদের পক্ষে পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেককে অতিরিক্ত সময় কাজ, ঋণ গ্রহণ কিংবা প্রয়োজনীয় ব্যয় সংকোচন করতে হয়।

এ পরিস্থিতিতে মজুরি নির্ধারণকে এককালীন সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে জীবনযাত্রার ব্যয়, উৎপাদনশীলতা, শিল্পের অবস্থা ও শ্রমিক পরিবারের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে নির্দিষ্ট সময় পরপর পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এ প্রক্রিয়ায় শ্রমিক, মালিক ও সরকারের প্রতিনিধিদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি মজুরি নির্ধারণের ভিত্তি, সময়সীমা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি স্পষ্ট রাখা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, নির্ধারিত সময়ে বেতন ও অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে। বেতন কিংবা অন্যান্য পাওনা আটকে থাকলে শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবনে আর্থিক সংকট তৈরি হয়। তাই বেতন পরিশোধের সময়সীমা মেনে চলা, বকেয়া পাওনা-সংক্রান্ত অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং পাওনা আদায়ের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। নিজের ন্যায্য পাওনা চাইতে গিয়ে কোনো শ্রমিক যাতে চাকরি হারানোর ভয় বা হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।

কর্মঘণ্টা ও বিশ্রামের অধিকারও শ্রমিকের স্বাস্থ্য এবং উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। দীর্ঘ সময় কাজ, পর্যাপ্ত বিরতির অভাব এবং অতিরিক্ত কাজের যথাযথ পারিশ্রমিক না দেওয়া শ্রমিকদের শারীরিক ও মানসিক চাপ বাড়ায়। বিশেষ করে রাতের পালায় কাজ, ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্র পরিচালনা এবং গরম ও বদ্ধ পরিবেশে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও বিশ্রামের ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। নির্ধারিত কর্মঘণ্টা এবং অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকিও জরুরি।

নিরাপদ কর্মপরিবেশ শ্রমিকের মৌলিক অধিকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, কারখানা ও অন্যান্য কর্মস্থলে অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমনপথ, নিরাপদ যন্ত্রপাতি, পরিচ্ছন্নতা এবং পর্যাপ্ত আলো-বাতাস নিশ্চিত করতে হবে। কর্মস্থলের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী ও স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ, নিয়মিত মহড়া ও কর্মস্থল পরিদর্শন কার্যক্রমের অংশ করতে হবে।

শ্রমিকদের কল্যাণে চিকিৎসাসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। কর্মস্থলে প্রাথমিক চিকিৎসা, দুর্ঘটনায় দ্রুত সহায়তা, অসুস্থতাজনিত ছুটি এবং কর্মক্ষেত্রে আহত হলে ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। নারী শ্রমিকদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, নিরাপদ যাতায়াত এবং শিশুকে দুধ পান করানোর উপযোগী পরিবেশের ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ও বৈষম্যের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ও গোপনীয় ব্যবস্থা রাখতে হবে।

শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁদের সংগঠিতভাবে কথা বলা, প্রতিনিধি নির্বাচন, দাবি উত্থাপন ও অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকা জরুরি। শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে নিয়মিত আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা গেলে মজুরি, কর্মপরিবেশ, ছুটি ও নিরাপত্তা নিয়ে বিরোধ দ্রুত চিহ্নিত ও সমাধান করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনাকে সমস্যা সমাধানের মাধ্যম হিসেবে গুরুত্ব দিতে হবে।

শ্রমিকের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় সরকারের দায়িত্বের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, শ্রম আইন ও বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগ, নিয়মিত পরিদর্শন, অভিযোগ তদন্ত এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পরিদর্শন কার্যক্রম শুধু কাগজপত্র যাচাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কর্মস্থলে শ্রমিকদের বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে হবে। পাশাপাশি অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ শুনানি ও দ্রুত প্রতিকারের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মালিকপক্ষকেও আইন মেনে শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা এবং নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

তিনি মনে করেন, শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা শিল্প ও ব্যবসার স্বার্থের পরিপন্থী নয়। বরং ন্যায্য মজুরি, সময়মতো বেতন, নিরাপদ কর্মস্থল এবং সম্মানজনক আচরণ শ্রমিকদের মনোবল ও কর্মদক্ষতা বাড়ায়। কর্মক্ষেত্রে অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তা কমলে পারস্পরিক আস্থা তৈরি হয় এবং বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ, দক্ষ ও কর্মনিষ্ঠ শ্রমিক শিল্পের উৎপাদনশীলতা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করেন।

শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বিত দায়িত্ব পালনের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। সরকারের আইন প্রয়োগ ও তদারকি, মালিকপক্ষের ন্যায্য আচরণ এবং শ্রমিক প্রতিনিধিদের তথ্যভিত্তিক ও আলোচনামুখী ভূমিকা এক্ষেত্রে প্রয়োজন। পাশাপাশি শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের মতো মৌলিক সেবায় প্রবেশাধিকার বাড়ানো জরুরি।

তিনি বলেন, শ্রমিকের শ্রমে দেশের উৎপাদন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি সচল থাকে। অথচ সেই শ্রমিক যদি ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হন, নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন কিংবা নিজের কথা বলার সুযোগ না পান, তাহলে উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছায় না। তাই শ্রমিকের অধিকারকে দয়া বা অনুগ্রহ হিসেবে নয়, ন্যায্য পাওনা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। কর্মক্ষেত্রে অধিকার বাস্তবায়ন, শ্রমিকের কল্যাণকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে রাখা এবং অনিয়মের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।


মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রান নেই–উইকেট নেই, তবু ম্যাচসেরা

1

নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে শেভরনকে বিনিয়োগের আহ্বান প্রধান

2

জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে হামলার অভিযোগ, বিজয় রাকিন স

3

৮১ বছরে জাতিসংঘ: বিশ্বশান্তি ও মানবাধিকার রক্ষায় কার্যকর সংস

4

ইউসিবির ডিএমডি হলেন শফিকুর রহমান ও রীদওয়ানুল হক

5

হালাল সনদ নিয়ে বিভ্রান্তিকর সংবাদের প্রতিবাদ জানাল বিএসটিআই

6

ফুলবাড়ীতে নরওয়ের রাষ্ট্রদূতের ব্যস্ত দিন, স্কুল পরিদর্শন ও আ

7

দুঃসময়ে বিরোধী মতের আশ্রয় ছিল ডিআরইউ: রিজভী

8

শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ প্

9

দেশে সারের সংকট নেই, মজুদ ১৩ লাখ টন: কৃষিমন্ত্রী

10

প্রতিমন্ত্রীর সফরের দিনও অনুপস্থিত শিক্ষা কর্মকর্তা, উঠেছে ন

11

একনেকে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ কোটি টাকার ১২ প্রকল্প অনুমোদন

12

বাড়ির দোতলায়ও পানি, ভাই–বোনের খোঁজ পাচ্ছেন না গায়িকা পুতুল

13

ফুলবাড়ীতে স্বামীর খুন্তির আঘাতে গৃহবধূ নিহত, স্বামী আটক

14

সাংবাদিকদের দ্রুত অ্যাক্রিডিটেশন প্রদানের আহ্বান অনলাইন এডিট

15

নতুন পে-স্কেল চূড়ান্তে আরও বৈঠক, নিম্ন গ্রেডে বাড়তি সুবিধার

16

চার দিনের সরকারি সফরে আজ রাতে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

17

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিকে খেলাফত মজলিসের শুভেচ্ছা

18

সুষম বণ্টন ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান বিরোধীদলীয় ন

19

দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বাস্তবায়নে কঠোর সরকার: তথ

20