জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে আজ রাতে জাপানের উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হবে।শিরোনাম:
চার দিনের সরকারি সফরে আজ রাতে জাপানের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে তার এ সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম গত ২০ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানান, আগামী ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচির মধ্যে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজেরও আয়োজন করবেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী।
পররাষ্ট্র সচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সফরের মাধ্যমে দুই দেশের বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও গভীর করা, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর গতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত ‘বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট’ (ইপিএ) কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদারের বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ প্রশিক্ষণ নিয়েও আলোচনা হবে।
সফরকালে ‘জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরাম’-এ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পাশাপাশি জাপানের বিভিন্ন শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচিতে ‘জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ’ এবং ‘জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন’-এর চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক রয়েছে।
এ ছাড়া জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) প্রেসিডেন্ট, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রেসিডেন্ট এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গেও তার বৈঠকের কথা রয়েছে।
চার দিনের সফরে প্রধানমন্ত্রী চিবা প্রিফেকচারের ফুত্তসু সিটিতে এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। পাশাপাশি নাগোয়াতে ইউনিক্লোর সদর দপ্তর ও টয়োটা কারখানা পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে।
পররাষ্ট্র সচিব জানিয়েছেন, কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও সহযোগিতা চুক্তির খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে।
বর্তমানে প্রায় আটটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে দুই পক্ষ আলোচনা করছে। এর মধ্যে তিন থেকে চারটি প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়েও পৃথক চুক্তির বিষয়ে কাজ চলছে।
বাংলাদেশে জাপানি কারখানা স্থাপন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে দেশটির সহায়তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে।
দুই দেশের আলোচনায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি-স্থিতিশীলতা, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধান, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনের প্রচেষ্টার বিষয়ও স্থান পেতে পারে।
এর আগে গত এপ্রিলে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে একটি অনলাইন বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন তারেক রহমান। সেই আলোচনার ধারাবাহিকতায় বর্তমান সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ওই বৈঠকে এশিয়াজুড়ে জ্বালানি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাপানের নেতৃত্বাধীন একটি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছিল বাংলাদেশ।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রাক্কালে ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত ১২টি অগ্রাধিকার খাতে প্রায় ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বিনিয়োগ প্যাকেজের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবের কয়েকটি উদ্যোগ ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট (বিআইজি-বি)’-এর সঙ্গে যুক্ত।
প্রস্তাবিত প্যাকেজে পরিবহন ও নগর সংযোগ খাতে ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার, মাতারবাড়িসহ সমন্বিত শিল্প, বন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রের জন্য ৩ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার, উৎপাদন শিল্প, সেমিকন্ডাক্টর ও অটোমোবাইল খাতে ১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার, জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব রূপান্তরে ১ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোর জন্য ৯৪০ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া কৃষি, ওষুধ শিল্প, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, নীল অর্থনীতি, পর্যটন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পসহ অন্যান্য খাতের জন্য আরও ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে থাকবেন তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটি’র চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মো. শাকিরুল ইসলাম খান। সফরে অন্য সরকারি কর্মকর্তা ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিরাও থাকবেন।
১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। ঢাকা মেট্রোরেলসহ দেশের বিভিন্ন বড় অবকাঠামো প্রকল্পে জাপানের সহায়তা রয়েছে।
এর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ ও ১৯৮০ সালে জাপান সফর করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশটি সফর করেন ১৯৯৪ ও ২০০৫ সালে।
মন্তব্য করুন