লেখা: আমিনুর রহমান হৃদয়
সাংবাদিকতাকে সমাজের আয়না বলা হয়। সমাজের নানা অন্যায়, অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র লেখনী, ছবি কিংবা ভিডিওর মাধ্যমে মানুষের সামনে তুলে ধরাই একজন সংবাদকর্মীর মূল দায়িত্ব। রাষ্ট্র ও সরকারের কর্মকাণ্ডকে প্রশ্ন করা, ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং সাধারণ মানুষের পক্ষে কথা বলাই এই পেশার সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতার নামে এক শ্রেণির মানুষের কর্মকাণ্ড গোটা পেশাটিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বর্তমানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা সভা-সমাবেশে একটি দৃশ্য প্রায়ই চোখে পড়ে। দেখা যায়, কোনো মন্ত্রী, সংসদ সদস্য কিংবা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার পাশে অতিথির সারিতে বসে আছেন কোনো সাংবাদিক বা সাংবাদিক নেতা। এখানেই প্রশ্ন জাগে— একজন সাংবাদিক যখন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ব্যক্তিদের পাশে অতিথির মর্যাদায় বসেন, তখন কি তাঁর পেশাগত নিরপেক্ষতা অটুট থাকে? একজন সাংবাদিকের প্রকৃত অবস্থান তো মঞ্চে নয়; বরং মঞ্চের সামনে সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত স্থানে। সেখান থেকেই তিনি রাষ্ট্র ও সমাজের অনিয়ম নিয়ে নির্ভয়ে প্রশ্ন করবেন। কিন্তু যখন তিনি নিজেই মঞ্চের আতিথেয়তা গ্রহণ করেন, তখন তিনি আর প্রশ্নকারী থাকেন না; বরং অজান্তেই ক্ষমতার বলয়ের অংশ হয়ে ওঠেন।
এই প্রভাবশালী সাংবাদিক সংস্কৃতি আজ সমাজের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতার খুব কাছাকাছি থাকার সুযোগ অনেকের মধ্যে এক ধরনের অহংবোধ তৈরি করে। তাঁরা তখন নিজেদের আর সাধারণ সাংবাদিক হিসেবে দেখেন না; বরং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন। এর ফলে ব্যক্তিগত স্বার্থে ক্ষমতাবানদের বড় বড় অনিয়ম ও দুর্নীতির সংবাদ অনেক সময় প্রকাশের বাইরে থেকে যায়। শুধু তাই নয়, নিজেদের অবস্থান অটুট রাখতে তাঁরা মাঠপর্যায়ের সৎ ও সাহসী সাংবাদিকদের ওপর নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করেন এবং সত্য প্রকাশের পথেও বাধা হয়ে দাঁড়ান। এমনকি সাংবাদিকতার মূল আদর্শ থেকে সরে গিয়ে প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদ দখলের চেষ্টাও করেন।
সাংবাদিকতা কখনোই কোনো দল, মত কিংবা নির্দিষ্ট ব্যক্তির পক্ষাবলম্বনের পেশা নয়। ক্ষমতা ও সাংবাদিকতা যখন একসঙ্গে পথ চলতে শুরু করে, তখন সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর দুর্বল হয়ে পড়ে। সমাজ যদি এই সুবিধাবাদী প্রবণতাকে চিহ্নিত করে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারে, তাহলে সত্য প্রকাশের পথ ক্রমেই সংকুচিত হবে। সাংবাদিকের আসন হোক পেশাদারিত্ব, সততা ও নিরপেক্ষতার জায়গায়— ক্ষমতার মঞ্চে নয়। দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের প্রকৃত কণ্ঠস্বর হিসেবেই টিকে থাকুক সাংবাদিকতা।
মন্তব্য করুন