অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Oct 20, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

পাকিস্তানে সন্ত্রাসবিরোধী আইন কি বিরোধী দমনের হাতিয়ার?

পাকিস্তানে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় রাজনৈতিক নেতা ও অধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা বাড়ছে। সন্ত্রাসবাদের বিস্তৃত সংজ্ঞা এবং আইনটির প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—জঙ্গিবাদ দমনের উদ্দেশ্যে প্রণীত আইনটি কি রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনের হাতিয়ার হয়ে উঠছে?


পাকিস্তানে রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রয়োগ বাড়ছে। সম্প্রতি দেশটির খাইবার পাখতুনখাওয়ার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ত্রাসবাদ মামলায় আসামি করা হয়েছে। এর ফলে এ আইনের আওতায় অভিযুক্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের তালিকা আরও দীর্ঘ হলো।

১৯৯৭ সালে পাকিস্তানে সন্ত্রাসবিরোধী আইন কার্যকর করা হয়। সে সময় দেশটির জনবহুল দুটি প্রদেশে সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত সহিংসতা চলছিল। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে প্রচলিত বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি বিশেষ আদালত গঠনের সুযোগ রাখা হয় এ আইনে।

পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযান শুরুর পর পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পুনর্গঠিত হতে থাকে। ২০০৭ সালে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) মতো গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। এরপর দেশটিতে একের পর এক প্রাণঘাতী হামলা চালায় তারা।

জঙ্গিবাদ মোকাবিলার জন্য প্রণীত আইনটি পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও প্রয়োগ করা হতে থাকে। ১৯৯৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল পারভেজ মোশাররফ এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের ভাই নওয়াজ শরিফও ২০০০ সালে এ আইনের আওতায় মামলার মুখে পড়েছিলেন।

পাকিস্তানে পুলিশি কার্যক্রম নিয়ে গবেষণাকারী জোহা ওয়াসিমের মতে, সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা অত্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় আইনটির অপপ্রয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কয়েক দশকে একাধিক সংশোধনীর মাধ্যমে আইনের পরিধি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। ফলে মুক্তিপণের জন্য অপহরণ, ছিনতাই, অর্থ পাচার কিংবা নিষিদ্ধ সংগঠনকে সহায়তা করার মতো অভিযোগও সন্ত্রাসবাদের মামলার আওতায় আসতে পারে।

খাইবার পাখতুনখাওয়ার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির বিরুদ্ধে করা মামলাটির সূত্রপাত ২০২৩ সালে। সে সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর সমর্থকেরা একটি রাষ্ট্রীয় বেতারকেন্দ্রে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। ওই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মামলায় আফ্রিদিকে আসামি করা হয়েছে। বর্তমানে প্রদেশটিতে জরুরি শাসন চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান নিজেও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে মামলার মুখোমুখি রয়েছেন। একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে নিষিদ্ধ একটি কট্টরপন্থী ইসলামপন্থী দলের নেতাদের বিরুদ্ধেও। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাশ্মীরি, পশতুন ও বেলুচ অধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধেও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হয়েছে।

আইনটির বিস্তৃত প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক রাজনীতিক শিরিন মাজারি। তাঁর মেয়ে আইনজীবী ইমান মাজারি ও জামাতা হাদি আলী চট্টা বর্তমানে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে বিচারের মুখোমুখি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের দেওয়া পোস্টসংক্রান্ত একটি মামলার পর তাঁদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস ছড়ানোর অভিযোগসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। জানুয়ারি থেকে তাঁরা কারাগারে রয়েছেন।

শিরিন মাজারির নিজেরও কারাবন্দি থাকার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে এবার মেয়ে ও জামাতার পরিস্থিতিতে তিনি অসহায় বোধ করছেন। তাঁর ভাষায়, ‘কিছুই করার নেই।’

পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় বিশেষ আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তেমন প্রশ্ন নেই। তবে আইনের সংজ্ঞা ও প্রয়োগের পরিধি যখন রাজনৈতিক বিরোধী এবং অধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে, তখন ন্যায়বিচার নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়।

সন্ত্রাসবাদের প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি আইনের অপপ্রয়োগ রোধ করাও গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রণীত আইন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।


মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দুবাইয়ের সম্পদ নিয়ে ৭৩ বাংলাদেশির তথ্য চাইবে দুদক

1

তুরস্কে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি

2

সিনেমা সমাজের মানসিকতা পরিবর্তনের শক্তিশালী মাধ্যম: তথ্যমন্ত

3

আ.লীগকে ফেরানোর পথ তৈরি করছে জামায়াত-এনসিপি: রাশেদ

4

বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার প্রত্যাশা এলজি

5

বিশ্ব বাস্তবতায় জাতিসংঘের ছয় অগ্রাধিকার

6

আসামে উচ্ছেদ অভিযানে বাস্তুচ্যুত হাজারো মুসলিম পরিবার, মসজিদ

7

কোহাটে মসজিদে বোমা হামলা, নিহত ২৭

8

তারেক রহমানের সঙ্গে এডিটেড ছবি পোস্ট, সমালোচনায় ছাত্রদল নেতা

9

বৃহত্তর খুলনার প্রথম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি ব্রজলাল কল

10

সেমিকন্ডাক্টর খাতের বিকাশে টাস্কফোর্স গঠন, সদস্য ১৩ জন

11

ঘর থেকে সংসদ: নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় পাঁচ দফা দাবি

12

সাংবাদিক-সংস্কৃতিকর্মীদের মর্যাদা ও পেনশন নিশ্চিতের দাবি

13

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল স্তম্ভ গণমাধ্যম: রাষ্ট্রপতি

14

২০২৮-২৯ অর্থবছরেই ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হবে ভারত

15

অক্টোবরেই শুরু হতে পারে ইউপি ভোট, মার্চের মধ্যে শেষ তিন স্তর

16

'ঘুর ঘুর পার্টি'র দৌরাত্ম্যে প্রশ্নের মুখে সাংবাদিকতার বিশ্ব

17

সাগরে মালয়েশিয়াগামী ৬৫ যাত্রী উদ্ধার, আটক ১১ মানবপাচারকারী

18

দেশের সম্পদ লুটপাট করে বিদেশে বিলাসী জীবনযাপন করছেন: রিজভী

19

স্বামীর পার্টনার হোন, প্রতিপক্ষ নয়

20