শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস জেলা শহরের কাছাকাছি স্থাপনের দাবিকে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব মোর্শেদ টিপু মাদবরকে ‘ঘাড় থেকে মাথা সরিয়ে দেওয়ার’ হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আমিনুর রহমান আমান মাদবরের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের স্থান নির্ধারণ নিয়ে চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ নতুন করে প্রকাশ্যে এসেছে। গত রোববার (১ নভেম্বর) সকালে শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গণে সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব মোর্শেদ টিপু মাদবরের বিরুদ্ধে আয়োজিত বিক্ষোভ কর্মসূচিতে বক্তব্য দেওয়ার সময় তাঁকে উদ্দেশ করে এ হুমকি দেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আমিনুর রহমান আমান মাদবর।
এ সময় বিএনপি এবং দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা তাঁর পাশে উপস্থিত ছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য দিচ্ছেন আমান মাদবর। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদের হুইপ ও শরীয়তপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মিয়া নুরুদ্দিন আহমেদ অপুকে নিয়ে কটূক্তির প্রতিবাদে তাঁরা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দল থেকে বহিষ্কার ও গ্রেপ্তারের দাবিও জানান তিনি।
আমান মাদবর আরও বলেন, জেলা বিএনপির নেতারা তাঁদের সড়ক অবরোধ তুলে নিতে বলেছেন। পাশাপাশি এক থেকে দুই দিনের মধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দল থেকে বহিষ্কার ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন।
বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, মিয়া নুরুদ্দিন আহমেদ অপুকে নিয়ে কোনো ষড়যন্ত্র হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যত শক্তিশালীই হোক, তাঁর ঘাড় থেকে মাথা সরিয়ে দেওয়া হবে এবং তাঁকে শরীয়তপুরে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হবে।
এর আগে, গত ২৮ অক্টোবর শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস জেলা শহরের কাছাকাছি স্থাপনের দাবিতে সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব মোর্শেদ টিপু মাদবরের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ওই কর্মসূচির পর জাতীয় সংসদের হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহমেদ অপুকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীরা।
এর প্রতিবাদে গত রোববার সকালে জেলা যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের একাংশের নেতাকর্মীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। পরে তাঁরা শহরের প্রধান সড়ক অবরোধ করে টিপু মাদবরের বহিষ্কার ও গ্রেপ্তারের দাবি জানান। এ সময় জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সরদার এ কে এম নাসির উদ্দিন কালুর কাছে স্মারকলিপিও দেন বিক্ষোভকারীরা।
অন্যদিকে, আমান মাদবরের বক্তব্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পরদিন সোমবার রাতে ঢাকা-শরীয়তপুর মহাসড়কের পাশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবিতে স্থানীয়দের নিয়ে আয়োজিত এক উঠান বৈঠকে বক্তব্য দেন টিপু মাদবর।
সেখানে নিজের ছবি পোড়ানো এবং তাঁকে দেওয়া হুমকির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বিভিন্ন জায়গায় তাঁর ছবি পোড়ানো হচ্ছে এবং ঘাড় থেকে মাথা নামিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। গত ১৭ বছর তিনি না থাকলে শরীয়তপুর শহরে কেউ মিছিল করার সাহস পেতেন না বলেও দাবি করেন তিনি।
২০১৮ সালে দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচির প্রসঙ্গ তুলে টিপু মাদবর বলেন, ওই সময় শফিকুর রহমান কিরণ, সাঈদ আহমেদ আসলাম ও কালু সরদারের বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে তাঁদের রক্ষা করেছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
নিজের জীবনের বড় একটি সময় রাজনৈতিক সংগ্রামে কেটেছে উল্লেখ করে টিপু মাদবর বলেন, কেউ যেন তাঁকে যুদ্ধের হুংকার না দেন। শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শহরের প্রাণকেন্দ্রে স্থাপিত হোক—এটাই তাঁর প্রত্যাশা। এ দাবির পেছনে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আমিনুর রহমান আমান মাদবর অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমি এ ধরনের বক্তব্য দিইনি। আপনারা ভালো করে শোনেন।’ এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
অন্যদিকে, হুমকির ভিডিও সম্পর্কে জানতে চাইলে সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব মোর্শেদ টিপু মাদবর বলেন, তাঁকে উদ্দেশ করে দেওয়া হুমকির ভিডিওটি তিনি দেখেছেন। এ ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের স্থান নির্ধারণ নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতাকর্মীদের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ও প্রকাশ্যে হুমকির ঘটনায় শরীয়তপুরের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।