জাতিসংঘের মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের ২৬ অনুচ্ছেদের আলোকে শিক্ষাকে বাংলাদেশের সংবিধানে সরাসরি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ শ্রম মর্যাদার জোর—বাংলাদেশ কল ফর লেবার ডিগনিটি (বিসিএলডি)-এর সমন্বয়ক, শ্রমিক নেতা, রাজনৈতিক কর্মী ও মানবাধিকার সংগঠক মোহাম্মদ বজলুর রহমান বাবলু।
রোববার (২৫ অক্টোবর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এ দাবি জানান। একই সঙ্গে সবার জন্য বৈষম্যহীন ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত এবং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কারের আহ্বান জানান তিনি।
বজলুর রহমান বাবলু বলেন, শিক্ষা কোনো বিশেষ শ্রেণি বা গোষ্ঠীর জন্য নির্ধারিত সুযোগ নয়, এটি প্রত্যেক মানুষের অধিকার। ব্যক্তির মর্যাদা, স্বাধীনতা, কর্মসংস্থান, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
জাতিসংঘের মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের ২৬ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সেখানে প্রত্যেক মানুষের শিক্ষালাভের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার প্রসারের কথা রয়েছে। তবে শিক্ষাকে সংবিধানের তৃতীয় ভাগে সরাসরি বলবৎযোগ্য মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এ কারণে শিক্ষার অধিকার বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা আরও সুস্পষ্ট ও কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে আলোচনা জরুরি।
বিবৃতিতে বলা হয়, শিক্ষার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দারিদ্র্য, সামাজিক ও ভৌগোলিক বৈষম্য, আর্থিক অসচ্ছলতা এবং শিক্ষা উপকরণের ব্যয়ের কারণে অনেক শিশু ও তরুণ মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন।
একই সঙ্গে নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন বজলুর রহমান বাবলু।
তিনি বলেন, শিক্ষা মানুষের সামগ্রিক বিকাশের ভিত্তি। একে শুধু বাজারের চাহিদা বা কর্মসংস্থানের উপকরণ হিসেবে বিবেচনা না করে মানুষের চিন্তা, বিবেক, সৃজনশীলতা, মানবিক মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক চেতনা বিকাশের মাধ্যম হিসেবে দেখতে হবে। এজন্য শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ও বৈষম্য কমিয়ে সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে কার্যকর নীতি গ্রহণ প্রয়োজন।
সরকারের প্রতি শিক্ষায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধ এবং দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
পাশাপাশি শিক্ষাকে সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ও নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানান বিসিএলডির এই সমন্বয়ক।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা কোনো একক ব্যক্তি বা সংগঠনের দায়িত্ব নয়। এ লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, শ্রমিক, পেশাজীবী, নাগরিক সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে প্রতিটি শিশুর শিক্ষালাভের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, কাউকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রেখে টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার কিংবা সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
বজলুর রহমান বাবলু শিক্ষাকে কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, মানুষের অধিকার হিসেবে উল্লেখ করে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য মানসম্মত, বৈষম্যহীন ও সহজলভ্য শিক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
বিবৃতিতে ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো—শিক্ষাকে সংবিধানে সরাসরি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার; সবার জন্য অবৈতনিক, বাধ্যতামূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা; দরিদ্র ও শ্রমজীবী পরিবারের সন্তানদের জন্য কার্যকর শিক্ষা সহায়তা; কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও উচ্চশিক্ষায় সমান সুযোগ; শিক্ষায় বৈষম্য, ঝরে পড়া ও আর্থিক প্রতিবন্ধকতা কমাতে কার্যকর নীতি এবং শিক্ষার অধিকার সম্পর্কে জনসচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আইনগত ও নীতিগত সংস্কার বাস্তবায়ন।
মন্তব্য করুন