টানা তিন দিনের উত্তেজনা, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, দফায় দফায় সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি এবং ১৪৪ ধারা জারির আবেদনকে ঘিরে তৈরি হওয়া অস্থিরতার পর অবশেষে স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরেছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) ক্যাম্পাস।
বুধবার (৫ আগস্ট) জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে একই মঞ্চে উপস্থিত হন ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। কয়েক দিন আগেও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া দুই সংগঠনের সদস্যদের একসঙ্গে কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা যায়।
দিবসটি উপলক্ষে সকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে আনন্দ শোভাযাত্রা, বৃক্ষরোপণ এবং শহীদদের স্মরণে নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন।
ছাতা হাতে অংশগ্রহণকারীরা ক্যাম্পাসের প্রধান সড়ক ও আবু সাঈদ চত্বর প্রদক্ষিণ করে আনন্দ শোভাযাত্রা সম্পন্ন করেন। পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বৃক্ষরোপণ করা হয়।
এর আগে সোমবার সন্ধ্যায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে দণ্ডিত কয়েকজন নেতার ছবি প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন, যাদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা গুরুতর ছিল।
ঘটনার পর মঙ্গলবার একই স্থানে পৃথক কর্মসূচি ঘোষণা করে দুই সংগঠন। এতে নতুন করে সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দিলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থান নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারির আবেদনও করে।
এমন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির পর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসের কর্মসূচিতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের একই মঞ্চে দেখা যাওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, তবে তা কোনোভাবেই সহিংসতায় রূপ নেওয়া উচিত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা এবং জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করতে পারস্পরিক সহাবস্থান ও সংলাপের কোনো বিকল্প নেই।
বেরোবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ইয়ামিন ইসলাম বলেন, জুলাই যেমন সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল, সেই ঐক্য ধরে রেখেই নতুন বাংলাদেশ গড়তে হবে। মতবিরোধ থাকলেও তা সংঘর্ষে রূপ নেওয়া উচিত নয়। গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে ছাত্রসমাজের ঐক্য অপরিহার্য।
বেরোবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মো. আব্দুর রাকিব মুরাদ বলেন, ক্যাম্পাসে ফ্যাসিবাদবিরোধী সব ছাত্রশক্তির সহাবস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে আবারও একই মঞ্চে আসা হয়েছে। ভবিষ্যতেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের পরিবেশ বজায় থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে দেশে যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে এসেছিল, সেই ঐক্য ধরে রাখতে হবে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে এবং কোনো ভুলের কারণে যেন অতীতের অগণতান্ত্রিক পরিস্থিতি ফিরে না আসে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির একই মঞ্চে অবস্থান করে প্রমাণ করেছে যে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পুনরাবৃত্তি আর হবে না। মতের ভিন্নতা থাকলেও আলোচনা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয় আবারও শিক্ষা, গবেষণা এবং ইতিবাচক ছাত্ররাজনীতির পরিবেশে এগিয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশাই সবার।
মন্তব্য করুন