সরকারি চাকরিজীবী, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে আরও কয়েক দফা বৈঠক শেষে সুপারিশ সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) সকালে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে জাতীয় বেতন কমিশন–২০২৫-এর সুপারিশ প্রণয়ন কমিটির ষষ্ঠ বৈঠকে নতুন পে-স্কেলের সুপারিশ চূড়ান্ত হওয়ার কথা থাকলেও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
বৈঠক-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বেতন কাঠামোর বিভিন্ন দিক আরও গভীরভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। এজন্য সামনে আরও কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। তবে বৈঠকের সংখ্যা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
কমিটি প্রথম বছরে মূল বেতন বৃদ্ধি এবং পরবর্তী বছরে বিভিন্ন ভাতা সমন্বয়ের যে প্রস্তাব রয়েছে, সেটিকে বাস্তবায়নের পক্ষে মত দিয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব মন্ত্রিসভার ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হবে।
বেতন কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর পর্যবেক্ষণও গুরুত্ব পাচ্ছে। আইএমএফের মতে, সরকারের রাজস্ব আয় এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি এবং বাজেট ঘাটতির চাপ বিদ্যমান। ফলে বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থ সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, আইন সচিব, প্রতিরক্ষা সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সচিব, স্বাস্থ্যসেবা সচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, হিসাব মহানিয়ন্ত্রকসহ কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে অনুষ্ঠিত পাঁচটি বৈঠকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো, গ্রেডভিত্তিক বৈষম্য, মূল্যস্ফীতির প্রভাব, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত ভাতা, পেনশন এবং অবসর-পরবর্তী সুবিধাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
সর্বশেষ ৬ জুলাইয়ের বৈঠকে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে সব গ্রেডে সমান হারে বেতন না বাড়িয়ে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে মতৈক্য হয়েছে।
অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে ১ম থেকে ৯ম গ্রেড পর্যন্ত বেতন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
পর্যালোচনা কমিটি নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে সরকারের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ প্রস্তুত করবে। পরে তা মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। প্রয়োজন হলে মন্ত্রিসভা সুপারিশে পরিবর্তন, সংযোজন কিংবা বিয়োজন করতে পারবে। অনুমোদনের পর অর্থ মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করলে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর প্রতি বছর মূল বেতনে ৫ শতাংশ বার্ষিক বৃদ্ধি দেওয়া হলেও নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়নি। ফলে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় রয়েছেন সরকারি চাকরিজীবীরা।
২০২৫ সালে সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল।
কমিশনের প্রতিবেদনে সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি বৈশাখি ভাতা ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত যাতায়াত ভাতায় বড় ধরনের সংস্কারেরও সুপারিশ করা হয়েছিল।
উল্লেখ্য, ওই সুপারিশ পর্যালোচনার জন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়।
মন্তব্য করুন