
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের চিন্তাভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে আজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভাষণের সম্ভাব্য বিষয়গুলো তুলে ধরেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রা, আইনের শাসন, জবাবদিহি, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং টেকসই উন্নয়ন নিয়ে কথা বলবেন। পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহযোগিতা, তরুণ ও নারী ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট, আধুনিক প্রযুক্তির সমতাভিত্তিক ব্যবহার এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও উঠে আসবে।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘে তারেক রহমানের এটিই প্রথম অংশগ্রহণ। ফলে আন্তর্জাতিক এই সর্বোচ্চ মঞ্চে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং ভবিষ্যৎ পথচলার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার ক্ষেত্রে এ ভাষণ বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
সাধারণ অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে চলমান রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে নতুন করে তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী। সংকট সমাধানে বিশ্বব্যাপী আরও জোরালো সহযোগিতা আদায়ের চেষ্টা করবেন তিনি।
এ লক্ষ্যে আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের আয়োজনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে অনুষ্ঠিত একটি সাইড ইভেন্টে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দ্রুততম সময়ে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানাবেন তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র সচিব রোহিঙ্গা সংকটকে একটি ‘চলমান সমস্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিশ্বনেতাদের এই সম্মেলনে সংকটটির ভয়াবহতা এবং এর কারণে সৃষ্ট বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ আবারও তুলে ধরবে বাংলাদেশ।
সিয়াম বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের ব্যাপকতা, এর ফলে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ এবং বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সাহায্য ও সহযোগিতার বিষয়গুলো বিশ্ব দরবারে আবারও তুলে ধরা হবে।
বাংলাদেশ বরাবরই বলে আসছে, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই উপায়ে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনই এ সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান।
প্রধানমন্ত্রীর সফরে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিও বিশেষ অগ্রাধিকার পাবে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাবে বাংলাদেশ।
আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। পরদিন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বের ঝুঁকি নিয়ে আয়োজিত আরেকটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উদ্বোধনী বক্তব্য দেবেন তিনি।
জলবায়ু বিষয়ক এসব বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর উদ্বেগ তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ক্ষয়ক্ষতি পূরণ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের ওপর গুরুত্ব দেবেন তিনি।
সাধারণ পরিষদের ভাষণে বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার স্পষ্ট করবেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তরুণ ও নারী ক্ষমতায়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানাবেন।
বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাধান নিশ্চিত করতে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেবেন তিনি।
আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি বিষয়ক আরেকটি সাইড ইভেন্টে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সেখানে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নতুন সরকারের উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরবেন তিনি। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ধাত্রীসেবার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফরে জাতিসংঘের মূল কর্মসূচিগুলো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। এর বাইরে দ্বিপক্ষীয় ও অন্যান্য বৈঠকের সময়সূচি পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারণ করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে কুয়েতের ক্রাউনপ্রিন্স এবং ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তারেক রহমান।
এসব বৈঠকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার এবং ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে।
সরকারের অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে মেটা ও ওয়াল স্ট্রিটসহ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী।
আগামীকাল নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়বেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরের সব কর্মসূচি শেষে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর তাঁর দেশে ফেরার কথা রয়েছে।