
একইসঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশে পরিণত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় সংসদ সদস্যরা মুহুর্মুহু টেবিল চাপড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানান।
সৌরবিদ্যুতের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এতদিন আমরা আমদানি নির্ভর উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের গ্রাহক ছিলাম। বর্তমান সরকার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের যে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে যাচ্ছে, তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে আমরা কেবল গ্রাহক থাকব না, বরং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদক হব।’
বর্তমান সংকটকে কেন্দ্র করে উসকানিমূলক আচরণ না করে জনগণের সামনে প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরতে বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বিএনপির ঐতিহাসিক রেকর্ড রয়েছে জাতিকে প্রতিটি সংকটময় পরিস্থিতি থেকে সফলভাবে বের করে আনার। বিরোধীদলীয় সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে দ্রুতই দেশ ও জাতিকে এই বিদ্যুৎ ও গ্যাস সমস্যা থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে।’
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, ‘এই সমস্যা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শাসন আমলে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
বঙ্গোপসাগরে প্রতিবেশী দেশগুলোর গ্যাস আহরণের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘অদৃশ্য কোনো ইশারায় দেশের সীমানায় বঙ্গোপসাগর থেকে গ্যাস উত্তোলনের চেষ্টা করা হয়নি।’ বিশেষ কোনো দেশকে সুবিধা দেওয়া এবং তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই বঙ্গোপসাগরে খননকাজ বন্ধ রাখা হয়েছিল—এমন প্রচলিত ধারণার কথাও তিনি সংসদে তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকার দেশকে পুরোপুরি আমদানি নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
বর্তমান সংকটের পেছনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, নতুন সরকার গঠনের মাত্র ১০ থেকে ১২ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়। বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির প্রধান উৎস হওয়ায় এর প্রভাব সরাসরি গ্যাস ও তেল সরবরাহের ওপর পড়ে। একই সময়ে দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) একটিতে ইলেকট্রিক শকের কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটে এবং সেটি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যায়। এই জোড়া ধাক্কায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
চলমান সংকট নিয়ে রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি না করে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ২০২২ সালে তৎকালীন সরকার বিদ্যুতের ঘাটতি সামাল দিতে অফিসের সময়সূচি ও ব্যাংক লেনদেনের সময় পরিবর্তন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিল। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামে কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়ে রাষ্ট্রকে ঋণগ্রস্ত করে ফেলা হলেও বিদ্যুৎ সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান তারা করতে পারেনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে প্রায় ১৪০০ মানুষের আত্মত্যাগ এবং ৩০ হাজার মানুষের আহত ও পঙ্গুত্ব বরণের মধ্য দিয়ে অর্জিত গণতান্ত্রিক পরিবেশে সংকটকে কেন্দ্র করে উসকানিমূলক আচরণ করা হলে পতিত ও বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী চক্রই লাভবান হবে। সরকার ও বিরোধী দল উভয়কেই জনগণের কাছে বাস্তব পরিস্থিতি সঠিকভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানাই।’
দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে প্রধানমন্ত্রী বিএনপির অতীত ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) অতীতে যতবারই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে, ততবারই দেশকে যেকোনো বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে সফলভাবে বের করে এনেছে। জিয়াউর রহমানের নীতি ও দলের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে বিরোধীদলীয় সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে অতি দ্রুত দেশকে এই বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে আমরা সক্ষম হবো।’
বিকাল ৩টায় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। মাগরিবের নামাজের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদ অধিবেশন সমাপনী সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ সংসদে পড়ে শোনান।
সমাপনী অধিবেশনের রেওয়াজ অনুযায়ী প্রথমে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান এবং পরে সংসদ নেতা বক্তব্য দেন। প্রধানমন্ত্রী রাত ৭টা ৪৫ মিনিটে বক্তব্য শুরু করেন।
গত ২৭ আগস্ট ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয়েছিল।