
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ‘তীব্র জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে বেকারত্ব সৃষ্টি এবং দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক বিপর্যয় রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংসদে আলোচনার প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
বিরোধী দলের উত্থাপিত প্রস্তাবের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সারা বিশ্বে গালফ ওয়ারের (উপসাগরীয় যুদ্ধ) প্রভাবে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। এরপরও বোরো মৌসুমে কৃষকদের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সরকার ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম এক পয়সাও বাড়ায়নি।
পরে পাচার ঠেকাতে বাধ্য হয়ে সহনীয় পর্যায়ে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়। এর ফলে দেশের অর্থনীতি বা বাজেটে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়েনি বলেও দাবি করেন তিনি।
বিগত সরকারের সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গ্যাস বা জ্বালানির উৎস নিশ্চিত না করেই আগের সরকার একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে। দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস অনুসন্ধানের বদলে তারা বিদেশের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। নিজেদের দলের টাইকুন বা লুটেরাদের সুবিধা দিতে বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানির ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ক্যাপাসিটি চার্জ প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এই ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়টি ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা রেখে গিয়েছেন, যা আমরা ইনহেরিট (উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত) করেছি। কিন্তু এখন বিদ্যুতের প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী যে নতুন রেন্টাল পাওয়ার অনুমোদন দিয়েছেন, সেখানে কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ নেই।’
বিদেশ থেকে সীমান্ত পেরিয়ে বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অতিরিক্ত দামে বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা করে দেশের অর্থ অপচয় করা হয়েছে—এটি সরকার জানে। তবে এখনই সেই চুক্তি বাতিল করলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক আর্বিট্রেশনে (সালিশি) গড়াতে পারে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশে এমনিতেই বিদ্যুতের সংকট রয়েছে। এই মুহূর্তে ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ হারানোর ঝুঁকি নেওয়া সম্ভব নয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় ধৈর্য ধরে এগিয়ে যেতে হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রায় এক হাজার এমএমসিএফডি গ্যাস পাওয়া যাবে।
চীনের সঙ্গে জি-টু-জি ভিত্তিতে মাতারবাড়ীতে ১৮ মাসের মধ্যে তৃতীয় এফএসআরইউ (ভাসমান টার্মিনাল) স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এ ছাড়া বড়পুকুরিয়ায় দেশীয় কয়লা ব্যবহার করে ৬২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পায়রায় দ্বিতীয় ধাপে ১৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিষয়েও আলোচনা চলছে।
মাতারবাড়ীতে এলপিজি গ্যাসের টার্মিনাল ও স্টোরেজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং উইন্ডমিলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতেও বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত ১৭ বছরের জঞ্জাল, ফ্র্যাজাইল (ভঙ্গুর) ব্যাংকিং, ফ্র্যাজাইল বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আমরা ইনহেরিট করেছি। ছয় মাসের ভেতরে এই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা ওভারহলিং করে (ঢেলে সাজানো) সব সমস্যার সমাধান করে ফেলা সম্ভব নয়।’
তবে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, মানুষের যে ভোগান্তি হচ্ছে তা বর্তমান সরকারের সৃষ্টি নয়। এটি বিগত সরকারের রেখে যাওয়া জঞ্জালের ফল বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।