
নিকোলাস বিশ্বাস
নারী ও শিশু নির্যাতন শুধুমাত্র অপরাধের পরিসংখ্যান কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয় নয়; এটি একটি সমাজের মানবিকতা, নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার গভীর সংকটকে সামনে আনে। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী ও শিশু নির্যাতনের নানা ঘটনা উদ্বেগজনক হারে প্রকাশ পাচ্ছে। শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা, মানসিক নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, অপহরণ ও হত্যার মতো অপরাধ আমাদের সমাজে নিরাপত্তাহীনতার এক কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় পরিমণ্ডল, রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক জীবনের বিভিন্ন স্তরেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, পারিবারিক বিরোধ, সামাজিক কুসংস্কার এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যকে কাজে লাগিয়ে দুর্বল মানুষদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় নারী ও শিশুরা তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে থাকায় অপরাধীরা তাদের সহজ শিকার হিসেবে বিবেচনা করে। এর প্রভাব শুধু ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো সমাজের শান্তি, নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
২০২৬ সালেও বিশ্বজুড়ে নারী ও শিশু নির্যাতন একটি বড় মানবিক সংকট হিসেবে রয়ে গেছে। বিভিন্ন দেশে চলমান সশস্ত্র সংঘাত, মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে অর্থসংকট এবং লিঙ্গসমতার অগ্রযাত্রার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বহু বছরের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও বিশ্বে প্রতি তিনজন নারীর একজন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ঘনিষ্ঠ সঙ্গী বা অন্য কারও মাধ্যমে শারীরিক কিংবা যৌন সহিংসতার শিকার হন।
একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর নির্যাতনের ঘটনাও বাড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও অপপ্রচার চালিয়ে নারী সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, সামাজিক আন্দোলনের কর্মী এবং পরিচিত ব্যক্তিদের কণ্ঠ রোধের চেষ্টা করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের মে মাসে ইউনিসেফ শিশুদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা যৌন সহিংসতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে স্থানীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার, অপরাধীদের বিরুদ্ধে শূন্য-সহনশীলতা নীতি এবং বিচারহীনতার অবসানের আহ্বান জানিয়েছে।
বাংলাদেশেও নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ ও শিশু মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে এক মাসেই নারী ও শিশু নির্যাতনের ২,০১১টি মামলা দায়ের হয়েছে, যা আগের নয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ১,৬২১ জন নারী ও কিশোরী সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১,০৪২; অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে ৪৯০ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে এবং তাদের মধ্যে ১৯৫ জন শারীরিক, পারিবারিক বা যৌন নির্যাতনের পর প্রাণ হারিয়েছে।
এছাড়া দেশের বাস্তবতায় দেখা যায়, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রায় ৮৬ শতাংশ শিশু শৃঙ্খলার নামে শারীরিক সহিংসতার মুখোমুখি হয়। প্রায় ৪৭.২ শতাংশ কিশোরীর ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বাল্যবিবাহ ঘটে এবং প্রায় ৭০ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে সঙ্গীর নির্যাতনের শিকার হন।
তবে বাস্তব ঘটনা আরও বিস্তৃত। সামাজিক লজ্জা, প্রতিশোধের ভয়, অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও পারিবারিক চাপের কারণে অনেক ভুক্তভোগী আইনি সহায়তা নিতে পারেন না এবং আপস করতে বাধ্য হন।
দেশে ১০২টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল এবং ‘১০৯’ ও ‘১০৯২১’ জাতীয় হেল্পলাইন চালু থাকলেও বাস্তব প্রয়োগে এখনও বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নথিভুক্ত ৫,৬০০টিরও বেশি যৌন সহিংসতার মামলার মধ্যে মাত্র ২ শতাংশ মামলায় শাস্তি কার্যকর হয়েছে।
এ অবস্থায় শিশু বিষয়ক একটি স্বতন্ত্র বিভাগ গঠন, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন আরও কার্যকর করা, প্রশিক্ষিত শিশু সুরক্ষা কর্মী নিয়োগ এবং বিভিন্ন খাতের সমন্বয়ে একটি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সময়ের দাবি।
প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে অপরাধের ধরন এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়া বদলে গেছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় নির্যাতনের ছবি বা ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
এর ইতিবাচক দিক হলো—অপরাধ দ্রুত জনসমক্ষে আসে, জনমত তৈরি হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।
অন্যদিকে নেতিবাচক দিকও রয়েছে। সহিংসতার দৃশ্য বারবার দেখার ফলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক, মানসিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়। কোনো মা যখন শিশুর ওপর নির্যাতনের ভিডিও দেখেন, তখন নিজের সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। একইভাবে প্রকাশ্যে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা অন্য নারীদের স্বাধীন চলাফেরায় ভয় সৃষ্টি করে।
এছাড়া ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ, সংবেদনশীল ছবি ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা গুজব প্রচারের মাধ্যমে ভুক্তভোগীকে দ্বিতীয়বার মানসিকভাবে আঘাত করা হয়। তাই প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক সংঘাত এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বও নারী ও শিশু নির্যাতনের একটি বড় কারণ। মতপার্থক্য গণতন্ত্রের অংশ হলেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কখনোই সহিংসতার বৈধতা দিতে পারে না।
গণপিটুনি, প্রকাশ্যে অপমান কিংবা শারীরিক নির্যাতন মানুষের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে। যখন ক্ষমতা প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে সহিংসতা ব্যবহৃত হয়, তখন সমাজ ধীরে ধীরে মানবিক সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলে।
একইভাবে পারিবারিক সহিংসতাও গুরুতর সমস্যা। অনেক সময় এটিকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। স্ত্রী নির্যাতন, শিশুদের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নিষ্ঠুরতা কিংবা প্রবীণদের অপমান—সবই গুরুতর অপরাধ। কিন্তু সামাজিক চাপ ও সম্মানহানির ভয়ে ভুক্তভোগীরা নীরব থাকেন। এই নীরবতাই অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করে।
নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন।
প্রথমত, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও লিঙ্গসমতার শিক্ষা জোরদার করতে হবে। ছেলেদের শেখাতে হবে শক্তি মানেই অন্যের ওপর কর্তৃত্ব নয় এবং মেয়েদের অধিকার ও আইনি সহায়তা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।
তৃতীয়ত, ভুক্তভোগীকে দায়ী করার সামাজিক প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। অপরাধের দায় কেবল অপরাধীরই।
চতুর্থত, গণমাধ্যমকে ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রেখে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা করতে হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় শূন্য-সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় তার অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে নয়; বরং নারী, শিশু এবং অন্যান্য অরক্ষিত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতায়।
নারী ও শিশুর সুরক্ষা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রতিটি সচেতন নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা শেষ পর্যন্ত অপরাধকেই শক্তিশালী করে।
আমাদের এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নারী ঘরে ও বাইরে সমানভাবে নিরাপদ থাকবেন এবং শিশুরা ভয়মুক্ত পরিবেশে বেড়ে উঠবে। মতপার্থক্য কখনোই সহিংসতার অজুহাত হতে পারে না। নীরবতা ভেঙে সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদ ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমেই একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।