
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলায় অবৈধভাবে পরিচালিত একটি পুরনো ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাত কারখানার অ্যাসিড ও বিষাক্ত বর্জ্যে দূষিত ঘাস এবং পানি খেয়ে ছটফট করতে করতে পর্যায়ক্রমে ৬টি গরুর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও দুটি গরু আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে।
শুক্রবার (১০ জুলাই) সন্ধ্যায় উপজেলার দেবনগড় ইউনিয়নের দেবুপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। পরদিন বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হলে পরিবেশ অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ বিভাগ, পুলিশ এবং গণমাধ্যমকর্মীরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় কারখানায় ১৮ থেকে ২০ জন শ্রমিককে দেখা গেলেও অবৈধভাবে খোলা আকাশের নিচে গড়ে ওঠা কারখানার মালিক ও ম্যানেজার ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দেবুপাড়া গ্রামের মৃত সেরাজ উদ্দিনের ছেলে হাফিজুল ইসলামের তিনটি, একই গ্রামের পারমদ্দিনের ছেলে আমিরুল ইসলামের একটি, খাটিয়াগছ গ্রামের মজিবর রহমানের ছেলে শামসুল হকের একটি এবং একই গ্রামের ইসমাইল হকের ছেলে বাচ্চুর একটি গরু মারা গেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, এতে তাদের প্রায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া দেবুপাড়া গ্রামের হাসানের একটি এবং হাফিজুল ইসলামের আরও একটি গরু বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার দেবুপাড়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সুমন রেজা, ভজনপুরের আলামিনসহ কয়েকজনের সহযোগিতায় অবৈধভাবে পুরনো ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছিল। এ সময় ব্যাটারি থেকে বের হওয়া সিসা, অ্যাসিড ও অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য আশপাশে ফেলে রাখায় কৃষিজমি, ঘাস ও পানি দূষিত হয়ে পড়ে। সেই দূষিত ঘাস ও পানি খাওয়ার পরই গরুগুলোর মৃত্যু হয়েছে বলে তাদের দাবি।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক হাফিজুল ইসলাম বলেন, ব্যাটারি কারখানার অ্যাসিড মিশ্রিত ঘাস ও পানি খাওয়ার কারণে তার তিনটি গরু মারা গেছে। তিনি অবৈধ এই কারখানার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
আমিরুল ইসলাম বলেন, জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করে সংসার চালান তিনি। তার দুটি গরুই ছিল পরিবারের প্রধান সম্বল। একটি ইতোমধ্যে মারা গেছে এবং অন্যটি অসুস্থ। অসুস্থ গরুটিও মারা গেলে পরিবারটি চরম সংকটে পড়বে বলে তিনি জানান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কারখানায় ব্যাটারির বর্জ্য পোড়ানোর সময় ছড়িয়ে পড়া ধোঁয়া ও তরল বর্জ্যের কারণে শুধু গবাদিপশুই নয়, আশপাশের হাঁস-মুরগি, কৃষিজমি, ফসল ও গাছপালাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তেঁতুলিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) লাইছুর রহমান জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কারখানা-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করেছে এবং কারখানার কার্যক্রম আপাতত বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. নাজমুল হক বলেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলে একটি টিম পাঠানো হয়েছে। মৃত গরুগুলোর ময়নাতদন্ত করা হচ্ছে এবং নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হবে। পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। পাশাপাশি অসুস্থ গরুগুলোর চিকিৎসাও চলমান রয়েছে।
পঞ্চগড় পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল গফুর জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসককে অবহিত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা সুলতানা বলেন, ঘটনাটি জানার পর প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও থানা পুলিশকে দ্রুত ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।