
চলমান অর্থবছর শেষ হতে চললেও নানা আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঠাকুরগাঁও এলজিইডি। বছরের বিভিন্ন সময়ে জেলার সবকটি উপজেলার একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পে নিম্নমানের কাজের অভিযোগে স্থানীয় সচেতন মানুষ কাজ বন্ধ করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
বিভিন্ন স্থানে পরিদর্শনে গিয়ে স্থানীয়দের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়েন এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন বিশ্বাস। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেন, নিম্নমানের কাজের বিষয়ে এলজিইডির প্রকৌশলীদের একাধিকবার জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে এলাকাবাসী জেলা প্রশাসকের কাছে মোবাইল ফোনে অভিযোগ করলে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদও প্রকাশিত হয়।
জেলার বিভিন্ন সড়কে নিম্নমানের ইট ও খোয়া ব্যবহারের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রকাশ করেন অনেকে। এসব পোস্টে দাবি করা হয়, উন্নয়নকাজে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কাজের মান নিশ্চিত করতে এলজিইডির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন স্থানীয়রা।
সিনিয়র সাংবাদিক আব্দুল লতিফ লিটু তার ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করেন, প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ টাকার একটি প্রকল্প পরিদর্শনে গিয়ে নিম্নমানের কাজ দেখানোর পর স্থানীয়দের প্রশ্নের মুখে সেখান থেকে চলে যান নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন বিশ্বাস। সাংবাদিকদের ক্যামেরা দেখেও তিনি দ্রুত গাড়িতে উঠে পড়েন। অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি শুধু বলেন, ‘বিষয়টি দেখছি।’ অথচ নিম্নমানের কাজের বিল ঠিকাদারদের পরিশোধ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রকৌশলীর কাছে অনিয়ম যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
পুরো বছরজুড়ে নিম্নমানের কাজ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদানের পর থেকে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে তিনি মাসে প্রায় আটবার সৈয়দপুর বিমানবন্দরে যাতায়াত করেন। এতে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে প্রতি মাসে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা সরকারি অর্থ ব্যয় হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে দপ্তরের ভেতরে ও সচেতন মহলে নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি হলেও তিনি নিজের মতো করেই দপ্তর পরিচালনা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এক পর্যায়ে তিনি দাবি করেছিলেন, এলজিইডিতে তার ‘হেডম’ রয়েছে, না হলে চাকরি চলে যেত। অনুসন্ধানে জানা যায়, তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সদস্য ছিলেন এবং তার সদস্য নম্বর ছিল ৫৯। সংগঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রমেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। বর্তমানে তার ‘হেডম’ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী মানবজমিনকে জানান, তিনি এখন বিএনপির অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তাদের দাবি, তার কর্মকাণ্ডে দপ্তরের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জানা গেছে, চলমান অর্থবছরে ঠাকুরগাঁও জেলায় সরকারি ও বৈদেশিক অর্থায়নে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন হচ্ছে। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে এলজিইডির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও কাজের মান নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলজিইডির এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর সর্বসাকুল্যে বেতন প্রায় ৬০ হাজার টাকা। বাড়িভাড়া ও প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ বিভিন্ন কর্তনের পর হাতে থাকে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। অথচ প্রতি মাসে সরকারি গাড়ির ব্যক্তিগত ব্যবহার বাবদ প্রায় ৪৫ হাজার টাকা এবং বিমান ভাড়ায় আরও প্রায় ৪৪ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়। তার ভাষ্য, কমিশন বাণিজ্য ছাড়া এমন ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়।
এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের প্রায় ২ বছর ৯ মাসে সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করে প্রায় ১৩ লাখ ২০ হাজার টাকার সরকারি অর্থ ব্যয় হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন বিশ্বাসের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করে বিষয়টি এড়িয়ে যান।