
রাজধানীর মিরপুর-১৫ এলাকার আবাসন প্রকল্প বিজয় রাকিন সিটিতে নিরাপত্তা, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও সার্ভিস চার্জ নিয়ে বিরোধের জেরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ৩১ অক্টোবর ও ১ নভেম্বরের ঘটনায় নিরাপত্তাকর্মীদের মারধর, বাসিন্দাকে আহত করা এবং সোসাইটির কার্যালয় ও কমিউনিটি স্পেস নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন ফ্ল্যাট মালিকদের সংগঠনের নেতারা। তাঁদের দাবি, এসব ঘটনায় সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
রাজধানীর মিরপুর-১৫-এ অবস্থিত দেশের অন্যতম বৃহৎ আবাসন প্রকল্প বিজয় রাকিন সিটিতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও সার্ভিস চার্জ নিয়ে বিরোধের জেরে ফ্ল্যাট মালিকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ফ্ল্যাট মালিকদের সংগঠন ‘বিজয় রাকিন সিটি অ্যাপার্টমেন্ট ওনার্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ (ব্রাকাসল)-এর পক্ষ থেকে প্রশাসক আবু ইশতিয়াক আজিজ উলফাত এবং নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান রাকিন ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি (বিডি) লিমিটেডের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তোলা হয়েছে।
সংগঠনটির অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৩১ অক্টোবর প্রশাসক আবু ইশতিয়াক আজিজ উলফাতের নির্দেশে রাকিনের নিরাপত্তাকর্মী ও বহিরাগতদের ব্যবহার করে সোসাইটির নিয়োজিত নিরাপত্তাকর্মীদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় নিরাপত্তাকর্মীদের মারধর করা হয়। ঘটনার প্রতিবাদ করতে গেলে বি-৩ ভবনের বাসিন্দা কামরুল আহসান হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এর পরদিন, ১ নভেম্বর বহিরাগতদের মাধ্যমে সোসাইটির কার্যালয় এবং বিজয় রাকিন সিটির বিভিন্ন ভবনের কমিউনিটি স্পেস নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ ফ্ল্যাট মালিকদের। তাঁদের দাবি, এর মাধ্যমে আবাসন প্রকল্পের প্রশাসনিক কার্যক্রম, নিরাপত্তা কেন্দ্র ও সামাজিক পরিসরগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছে।
ফ্ল্যাট মালিকদের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আবু ইশতিয়াক আজিজ উলফাত সমিতির ব্যাংক হিসাবে জমা থাকা সদস্যদের অর্থ উত্তোলন করে ভুয়া খরচ দেখিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। পাশাপাশি সমিতির বৈধ সদস্যপদ বা যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগে বলা হয়, কিছু ফ্ল্যাট অবৈধভাবে দখল করে বহিরাগতদের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অর্থের বিনিময়ে অসদস্য ও বহিরাগতদের ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়ার আশ্বাস এবং সনদ বিতরণের অভিযোগও রয়েছে। একই সঙ্গে ২৭৪ জন বৈধ ও নিবন্ধিত ফ্ল্যাট মালিককে তাঁদের নিজস্ব ফ্ল্যাট থেকে উচ্ছেদের জন্য ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেছেন তাঁরা।
ফ্ল্যাট মালিকদের অভিযোগ, আবাসিক ভবনের বিভিন্ন জায়গায় বহিরাগতদের অবস্থান এবং তাঁদের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঘটনায় নারী, শিশু ও প্রবীণসহ বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। প্রতিবাদ করলে মব সৃষ্টি করে হয়রানি এবং মিথ্যা মামলায় জড়ানোর ভয় দেখানো হচ্ছে বলেও তাঁদের দাবি।
এদিকে, ১ নভেম্বর রাকিন কর্তৃপক্ষ একটি জরুরি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এতে পূর্বনির্ধারিত পাঁচ হাজার টাকার পরিবর্তে মাসিক সার্ভিস চার্জ ছয় হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে সরাসরি রাকিনের কার্যালয়ে ওই অর্থ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে রাকিন ছাড়া অন্য কোথাও সার্ভিস চার্জ জমা না দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। অন্যথায় সেবা বিঘ্নিত হতে পারে বলেও জানানো হয়।
ফ্ল্যাট মালিক ও ভাড়াটিয়াদের অভিযোগ, নতুন সার্ভিস চার্জ নির্ধারণ এবং অর্থ জমা দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে তাঁদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। তাঁদের দাবি, ছয় হাজার টাকা দিতে না পারলে আবাসন ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে গত ২ নভেম্বর বিজয় রাকিন সিটি অ্যাপার্টমেন্ট ওনার্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল বারী রাকিন ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে উদ্ভূত পরিস্থিতি, আগে উত্তোলন করা সার্ভিস চার্জের হিসাব এবং অন্যান্য অমীমাংসিত বিষয় সমাধানে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের উপস্থিতিতে জরুরি সভা আহ্বানের অনুরোধ জানানো হয়।
চিঠির অনুলিপি অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মিরপুর জোনের উপপুলিশ কমিশনার এবং কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছেও পাঠানো হয়েছে বলে সোসাইটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ফ্ল্যাট মালিকদের পক্ষ থেকে চার দফা দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—প্রশাসক আবু ইশতিয়াক আজিজ উলফাতকে অপসারণ এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ; ৩১ অক্টোবর ও ১ নভেম্বরের কথিত অবৈধ দখলদারিত্বের ঘটনায় আইনানুগ পদক্ষেপ; বহিরাগতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে ফ্ল্যাট মালিকদের হয়রানি ও উচ্ছেদের হুমকি বন্ধ; এবং সিটির নিয়ন্ত্রণ সোসাইটির কাছে ফিরিয়ে দেওয়া।
এ ছাড়া একতরফাভাবে নির্ধারিত ছয় হাজার টাকার সার্ভিস চার্জের বিজ্ঞপ্তি বাতিল, দখল করা ফ্ল্যাট ও কার্যালয় মুক্ত করা এবং বাসিন্দাদের নিরাপদে বসবাসের পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।