
খাসজমির অধিকার, ভূমিহীন মানুষের পুনর্বাসন ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার দাবিতে রংপুরে সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ ভূমিহীন আন্দোলন। সমাবেশ থেকে ভূমিহীনদের জন্য সংরক্ষিত সংসদীয় আসন, ভূমিহীন কার্ড প্রদান এবং স্বাধীন ভূমি-কৃষি সংস্কার কমিশন গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।
‘আগে পুনর্বাসন, পরে উন্নয়ন’, ‘খাসজমির অধিকার ভূমিহীন জনতার’ এবং ‘ভূমিদস্যু হঠাও, ভূমিহীন বাঁচাও’—এমন স্লোগান সামনে রেখে রংপুরে সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ ভূমিহীন আন্দোলন।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর ২০২৬) রংপুরের ঐতিহাসিক পাবলিক লাইব্রেরি মাঠের শহীদ মিনার চত্বরে সংগঠনটির রংপুর জেলা ও মহানগর শাখার উদ্যোগে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তারা ভূমিহীন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্র সংস্কার এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের দাবি জানান।
সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ভূমিহীন আন্দোলনের প্রধান উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম। বক্তব্যে তিনি বলেন, লুটপাট ও অর্থ পাচারের ব্যবস্থাকে কোনোভাবেই উন্নয়ন বলা যায় না। জনগণের কর্মসংস্থান এবং সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করাই প্রকৃত উন্নয়ন। দেশের সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচারকারীদের বিচারের জন্য অবিলম্বে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং পাচার হওয়া সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে কেউ শাসক বা শোষক নয়; এ দেশের প্রকৃত মালিক জনগণ। জনস্বার্থবিরোধী আমলাতান্ত্রিক ও ঔপনিবেশিক আইন বাতিল করে রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে জনমানুষের রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শেখ নাসির উদ্দিন ঢাকা শহরসহ সারাদেশের ভূমিহীন মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও চলমান সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভূমিহীন মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। প্রত্যেক ভূমিহীনকে ভূমিহীন কার্ড প্রদান করতে হবে। পাশাপাশি জাতীয় সংসদে ভূমিহীনদের জন্য সংরক্ষিত আসন এবং একটি স্বাধীন ভূমি-কৃষি সংস্কার কমিশন গঠনের দাবি জানান তিনি।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ভূমিহীন আন্দোলনের রংপুর বিভাগীয় সমন্বয়ক ও সাংগঠনিক সম্পাদক কনক রহমান। তিনি রংপুরের স্থানীয় সমস্যা তুলে ধরে বলেন, রংপুর বিভাগ ও জেলার সব ভূমিহীন মানুষকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারি সুযোগ-সুবিধাসহ পুনর্বাসন করতে হবে। এ ছাড়া শিল্পকারখানা স্থাপন ও কৃষির উন্নয়নের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।
সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিশিষ্ট শ্রমিক নেতা আমিন উদ্দিন বিএসসি, লালমনিরহাট জেলার আহ্বায়ক মো. আব্দুল হামিদ, কেন্দ্রীয় সহসভাপতি কামরুজ্জামান টিপু, গাইবান্ধা জেলার আহ্বায়ক মোছা. শাহীনুর বেগম এবং কুড়িগ্রাম জেলার কৃষক আন্দোলনের আহ্বায়ক মো. আরিফুল ইসলাম জুয়েল।
বক্তারা বলেন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের খাসজমি বণ্টন কমিটিতে ভূমিহীনদের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ভূমিদস্যুদের দখলে থাকা খাসজমি উদ্ধার করে প্রকৃত ভূমিহীন ও কৃষকদের মধ্যে বন্দোবস্ত দিতে হবে। এ ছাড়া বৈষম্যহীন উন্নয়নের স্বার্থে উপজেলাভিত্তিক সংসদীয় আসন নির্ধারণ, দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা, জনগণের ভোটাধিকার হরণ বন্ধ এবং গণতান্ত্রিক সরকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার দাবি জানান তাঁরা।
বাংলাদেশ ভূমিহীন আন্দোলনের রংপুর বিভাগের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রায়হান কবীরের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জেএসডি রংপুর মহানগর সভাপতি এবিএম মশিউর রহমান, রংপুর জেলা কমিটির আহ্বায়ক আব্দুল আলিম, যুগ্ম আহ্বায়ক হাসেম মুন্সি, সদস্যসচিব মোছা. ফাতেমা আখতার, যুগ্ম সদস্যসচিব মুশলেমুদ্দিন, মহানগর কমিটির আহ্বায়ক মোছা. সামছুন্নাহার, যুগ্ম আহ্বায়ক লিলি বেগম, সদস্যসচিব সেলিম মিঞা এবং যুগ্ম সদস্যসচিব আয়শা বেগম।
সমাবেশ থেকে নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ভূমিহীনদের যৌক্তিক দাবিগুলো অবিলম্বে মেনে নেওয়া না হলে দেশব্যাপী আরও বৃহত্তর গণআন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
সমাবেশ শেষে একটি র্যালি রংপুর শহর প্রদক্ষিণ করে। পরে রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও রংপুর জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।